১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৮
অধ্যায়- ১৩ : কিছু নিদর্শনের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ
আল্লাহর কুদরতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَلَمْ نَجْعَلِ الْاَ رْضَ مِهَادًا ‐ - وَّالْجِبَالَ اَوْتَادًا ‐ - وَّخَلَقْنَاكُمْ اَزْوَاجًا ‐ - وَّجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا ‐ وَّجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا ‐ وَّجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا ‐ وَّبَنَيْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعًا شِدَادًا ‐ - وَّجَعَلْنَا سِرَاجًا وَّهَّاجًا ‐ - وَّاَنْزَلْنَا مِنَ الْمُعْصِرَاتِ مَآءً ثَجَّاجًا ‐ - لِّنُخْرِجَ بِهٖ حَبًّا وَّنَبَاتًا ‐ - وَّجَنَّاتٍ اَلْفَافًا
আমি কি জমিনকে বিছানাস্বরূপ বানাইনি? এবং পাহাড়সমূহকে পেরেকস্বরূপ (করিনি)? আর আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়। আমিই তোমাদের নিদ্রাকে করেছি আরামদায়ক এবং রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ। আর আমিই দিবসকে জীবিকা অর্জনের সময় করে দিয়েছি। আর আমিই নির্মাণ করেছি তোমাদের উপর সাতটি মজবুত আসমান এবং আমিই সৃষ্টি করেছি একটি দীপ্তমান প্রদীপ। আর আমিই মেঘমালা থেকে প্রচুর পানি বর্ষণ করি। যেন আমি তা দিয়ে উৎপন্ন করি শস্য ও উদ্ভিদ এবং বৃক্ষরাজিতে পরিপূর্ণ বাগানসমূহ। (সূরা নাবা, ৬-১৬)
اَلَمْ نَخْلُقْكُّمْ مِّنْ مَّآءٍ مَّهِيْنٍ ‐ - فَجَعَلْنَاهُ فِيْ قَرَارٍ مَّكِيْنٍ ‐ اِلٰى قَدَرٍ مَّعْلُوْمٍ ‐ فَقَدَرْنَا فَنِعْمَ الْقَادِرُوْنَ ‐ - وَيْلٌ يَّوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِيْنَ ‐ - اَلَمْ نَجْعَلِ الْاَ رْضَ كِفَاتًا ‐ - اَحْيَآءً وَّاَمْوَاتًا ‐ - وَجَعَلْنَا فِيْهَا رَوَاسِيَ شَامِخَاتٍ وَّاَسْقَيْنَاكُمْ مَّآءً فُرَاتًا
আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি? অতঃপর আমি ওটাকে স্থাপন করেছি নিরাপদ স্থানে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। আমি একে গঠন করেছি সুবিন্যাস্তভাবে, অতএব আমি কতই না নিপুণ নিরূপণকারী! সেদিন মিথ্যারোপকারীদের জন্য দুর্ভোগ। আমি কি ভূমিকে জীবিত ও মৃতের জন্য বহনকারী রূপে সৃষ্টি করিনি? আমি তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় উচ্চ পর্বতমালা এবং তোমাদেরকে পান করিয়েছি সুপেয় পানি। (সূরা মুরসালাত, ২০-২৭)
বিশেষ চারটি জিনিসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَلَا يَنْظُرُوْنَ اِلَى الْاِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ ‐ - وَاِلَى السَّمَآءِ كَيْفَ رُفِعَتْ ‐ - وَاِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ ‐ - وَاِلَى الْاَ رْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
তারা কি উষ্ট্রপালের দিকে লক্ষ্য করে না যে, কীভাবে এগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে সমুচ্চ করা হয়েছে? পর্বতমালার দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে বসানো হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে? (সূরা গাশিয়া, ১৭-২০)
সুন্দর আকাশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَلَمْ يَنْظُرُوْاۤ اِلَى السَّمَآءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوْجٍ
এরা কি কখনো তাদের উপর অবস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে, কীভাবে আমি তা তৈরি করেছি ও তাকে সুশোভীত করেছি? আর তাতে কোন (সূক্ষ্মতম) ফাটলও নেই। (সূরা ক্বাফ- ৬)
ব্যাখ্যা : এখানে আসমান বলতে পুরো ঊর্ধবজগতকে বুঝানো হয়েছে। যা মানুষ রাত-দিন তার মাথার উপর ছেয়ে থাকতে দেখে। যেখানে দিনের বেলা সূর্য দীপ্তি ছড়ায়, রাতের বেলা চাঁদ এবং অসংখ্য তারকারাজি উজ্জল হয়ে দেখা দেয়। মানুষ যদি এগুলোকে খালি চোখেই দেখে তাহলেও সে বিস্মিত হয়ে পড়ে। আর দুরবিন লাগিয়ে দেখলে এমন একটি বিশাল সুবিস্তৃত সৃষ্টিজগৎ তার সামনে ভেসে ওঠে, যার কোন সীমা নেই। কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ হয়েছে বুঝা যাবে না। আমাদের পৃথিবীর চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ বড় গ্রহসমূহ এর মধ্যে বলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের সূর্যের চেয়ে হাজার হাজার গুণ উজ্জল তারকা তার মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আমাদের এ সৌরজগৎ তার একটিমাত্র ছায়াপথের এক কোণে পড়ে আছে। আল্লাহর কর্তৃত্ব কত ব্যাপক ও বিস্তৃত আমরা তার কোন অনুমানই করতে পারি না। আল্লাহ তা‘আলা এ বিশাল সৃষ্টিজগতকে অস্তিত্বদান করেছেন।
মানুষ ও পশুর খাবারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَوَلَمْ يَرَوْا اَنَّا نَسُوْقُ الْمَآءَ اِلَى الْاَ رْضِ الْجُرُزِ فَنُخْرِجُ بِهٖ زَرْعًا تَاْكُلُ مِنْهُ اَنْعَامُهُمْ وَاَنْفُسُهُمْؕ اَفَلَا يُبْصِرُوْنَ
তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি শুষ্ক ও পতিত জমিনে পানি প্রবাহিত করি; তারপর তার সাহায্যে শস্য উৎপাদন করি। অতঃপর তা থেকে ভক্ষণ করে তাদের চতুষ্পদ (চার পা বিশিষ্ট) জন্তুরা এবং তারা নিজেরাও? তবে কি তারা দেখে না? (সূরা সাজদা- ২৭)
فَلْيَنْظُرِ الْاِنْسَانُ اِلٰى طَعَامِهٖ ‐ - اَنَّا صَبَبْنَا الْمَآءَ صَبًّا ‐ - ثُمَّ شَقَقْنَا الْاَ رْضَ شَقًّا ‐ - فَاَنْۢبَتْنَا فِيْهَا حَبًّا ‐ - وَّعِنَبًا وَّقَضْبًا ‐ - وَّزَيْتُوْنًا وَّنَخْلًا ‐ - وَّحَدَآئِقَ غُلْبًا ‐ - وَّفَاكِهَةً وَّاَبًّا ‐ - مَّتَاعًا لَّكُمْ وَلِاَنْعَامِكُمْ
মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমিই প্রচুর পানি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভূমিকে অদ্ভুতভাবে বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, যায়তুন, খেজুর, বহু নিবিড়-ঘন বাগান, ফল এবং গবাদি পশুর খাদ্য (ঘাস); তোমাদের ও তোমাদের পশুগুলোর ভোগের সামগ্রী হিসেবে। (সূরা আবাসা, ২৪-৩২)
মানুষের আয়ত্তাধীন পশুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَوَلَمْ يَرَوْا اَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِّمَّا عَمِلَتْ اَيْدِيْنَاۤ اَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُوْنَ ‐ - وَذَلَّلْنَاهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوْبُهُمْ وَمِنْهَا يَاْكُلُوْنَ ‐ - وَلَهُمْ فِيْهَا مَنَافِعُ وَمَشَارِبُ اَفَلَا يَشْكُرُوْنَ
তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, আমি তাদের জন্য সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্য থেকে চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে সৃষ্টি করেছি? অতঃপর তারা এগুলোর মালিক হয়। আর আমি এগুলোকে তাদের অনুগত করে দিয়েছি, ফলে তারা এদের কতগুলোকে তাদের বাহনে পরিণত করে এবং কতগুলোকে ভক্ষণ করে। তাদের জন্য এগুলোর মধ্যে রয়েছে আরো অনেক উপকারিতা এবং বিভিন্ন ধরনের পানীয়। তবুও কি তারা শুকরিয়া আদায় করবে না? (সূরা ইয়াসীন, ৭১-৭৩)
নানা রঙ্গের পাহাড়, মানুষ ও পশুপাখির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللهَ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخْرَجْنَا بِهٖ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا اَلْوَانُهَاؕ وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ ۢبِيْضٌ وَّحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ اَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُوْدٌ -‐ وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَآبِّ وَالْاَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ اَلْوَانُهٗ كَذٰلِكَؕ اِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَآءُؕ اِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ غَفُوْرٌ
তুমি কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। তারপর আমি তা দিয়ে নানা বর্ণের ফলমূল উৎপন্ন করি। আর পর্বতমালারও রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ- সাদা, লাল ও ঘোর কাল। আর এভাবে মানুষ, বিভিন্ন প্রাণী ও চতুষ্পদ জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপ্রতাপশালী ও পরম ক্ষমাশীল। (সূরা ফাতির- ২৭, ২৮)
ফসল উৎপাদনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمْ مَّا تَحْرُثُوْنَ ‐ - اَاَنْتُمْ تَزْرَعُوْنَهٗۤ اَمْ نَحْنُ الزَّارِعُوْنَ ‐ - لَوْ نَشَآءُ لَجَعَلْنَاهُ حُطَامًا فَظَلْتُمْ تَفَكَّهُوْنَ ‐ - اِنَّا لَمُغْرَمُوْنَ ‐ - بَلْ نَحْنُ مَحْرُوْمُوْنَ
তোমরা যে বীজ বপন কর সে বিষয়ে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি তা অংকুরিত কর, না আমি অংকুরিত করি? আমি ইচ্ছা করলে একে খড়কুটায় পরিণত করতে পারি। তখন তোমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, (বলবে) আমরা তো বরবাদ হয়ে গেছি! বরং আমরা বঞ্চিত। (সূরা ওয়াক্বিয়া, ৬৩-৬৭)
সুপেয় পানির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمُ الْمَآءَ الَّذِيْ تَشْرَبُوْنَ ‐ اَاَنْتُمْ اَنْزَلْتُمُوْهُ مِنَ الْمُزْنِ اَمْ نَحْنُ الْمُنْزِلُوْنَ ‐ - لَوْ نَشَآءُ جَعَلْنَاهُ اُجَاجًا فَلَوْلَا تَشْكُرُوْنَ
তোমরা যে পানি পান কর সে বিষয়ে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি তা মেঘ হতে বর্ষাও, না আমিই বর্ষাই। আমি ইচ্ছা করলে ওটাকে লবণাক্ত বানাতে পারি। তবুও কি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না? (সূরা ওয়াক্বিয়া, ৬৮-৭০)
আগুনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمُ النَّارَ الَّتِيْ تُوْرُوْنَ ‐ - اَاَنْتُمْ اَنْشَاْتُمْ شَجَرَتَهَاۤ اَمْ نَحْنُ الْمُنْشِئُوْنَ
তোমরা যে আগুন জ্বালাও তা লক্ষ্য করে দেখেছ কি? তোমরাই কি তার বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? (সূরা ওয়াক্বিয়া- ৭১,৭২)
ব্যাখ্যা : কুরআন মাজীদ মোট ছয় প্রকার নিদর্শনাবলির দিকে ইঙ্গিত করেছে। আর তা হলো :
১. যে নিদর্শনগুলো পৃথিবী থেকে নিয়ে আকাশ পর্যন্ত প্রত্যেকটি জিনিসের এবং বিশ্বজাহানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে পাওয়া যায়।
২. যে নিদর্শনগুলো মানুষের নিজের জন্ম এবং তার গঠনাকৃতি ও অস্তিত্বের মধ্যে পাওয়া যায়।
৩. যে নিদর্শনগুলো মানুষের অনুভূতিতে এবং তার নৈতিক চিন্তাধারায় পাওয়া যায়।
৪. যে নিদর্শনগুলো মানুষের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়।
৫. যে নিদর্শনাবলি মানুষের প্রতি অবতীর্ণ পার্থিব বিপদাপদ ও আসমানী বালা-মুসিবতের মধ্যে পাওয়া যায়।
৬. আল্লাহ তাঁর নবীগণের মাধ্যমে যেসব নিদর্শনাবলি প্রেরণ করেছেন সেগুলো।
মানুষকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর জন্য এসব নিদর্শনাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর সেসব নিদর্শনসমূহকে দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কান এবং চিন্তার জন্য অন্তরও দান করা হয়েছে। এ সমস্ত নিদর্শন মানুষকে এ কথা বলে যাচ্ছে যে, তোমার উপাস্য মাত্র একজন। তাঁর ইবাদাত ও আনুগত্য ছাড়া তোমার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। তোমাকে এ জগতে স্বাধীন, স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বহীন করে পাঠানো হয়নি। জীবনের সমস্ত কাজ শেষ করে তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে জবাবদিহি করতে হবে এবং সে কাজের প্রেক্ষিতে পুরস্কার বা শাস্তি পেতে হবে। কাজেই আল্লাহ তোমাকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও কিতাবসমূহ পাঠিয়ে যে পথনির্দেশনা দিয়েছেন তা মেনে চলো এবং স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত থাকো। এরপরও সে যদি সমস্ত নিদর্শনের দিক থেকে চোখ ও কান বন্ধ করে নেয় এবং মন-মস্তিষ্ক দিয়েও উল্টা বুঝে, তাহলে তার চেয়ে বড় যালিম আর কেউ হতে পারে না। দুনিয়ায় পরীক্ষার মেয়াদ শেষ করে যখন সে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন সে পুরস্কার লাভের সকল ধরনের যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলবে। ফলে সে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।
اَلَمْ نَجْعَلِ الْاَ رْضَ مِهَادًا ‐ - وَّالْجِبَالَ اَوْتَادًا ‐ - وَّخَلَقْنَاكُمْ اَزْوَاجًا ‐ - وَّجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا ‐ وَّجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا ‐ وَّجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا ‐ وَّبَنَيْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعًا شِدَادًا ‐ - وَّجَعَلْنَا سِرَاجًا وَّهَّاجًا ‐ - وَّاَنْزَلْنَا مِنَ الْمُعْصِرَاتِ مَآءً ثَجَّاجًا ‐ - لِّنُخْرِجَ بِهٖ حَبًّا وَّنَبَاتًا ‐ - وَّجَنَّاتٍ اَلْفَافًا
আমি কি জমিনকে বিছানাস্বরূপ বানাইনি? এবং পাহাড়সমূহকে পেরেকস্বরূপ (করিনি)? আর আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়। আমিই তোমাদের নিদ্রাকে করেছি আরামদায়ক এবং রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ। আর আমিই দিবসকে জীবিকা অর্জনের সময় করে দিয়েছি। আর আমিই নির্মাণ করেছি তোমাদের উপর সাতটি মজবুত আসমান এবং আমিই সৃষ্টি করেছি একটি দীপ্তমান প্রদীপ। আর আমিই মেঘমালা থেকে প্রচুর পানি বর্ষণ করি। যেন আমি তা দিয়ে উৎপন্ন করি শস্য ও উদ্ভিদ এবং বৃক্ষরাজিতে পরিপূর্ণ বাগানসমূহ। (সূরা নাবা, ৬-১৬)
اَلَمْ نَخْلُقْكُّمْ مِّنْ مَّآءٍ مَّهِيْنٍ ‐ - فَجَعَلْنَاهُ فِيْ قَرَارٍ مَّكِيْنٍ ‐ اِلٰى قَدَرٍ مَّعْلُوْمٍ ‐ فَقَدَرْنَا فَنِعْمَ الْقَادِرُوْنَ ‐ - وَيْلٌ يَّوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِيْنَ ‐ - اَلَمْ نَجْعَلِ الْاَ رْضَ كِفَاتًا ‐ - اَحْيَآءً وَّاَمْوَاتًا ‐ - وَجَعَلْنَا فِيْهَا رَوَاسِيَ شَامِخَاتٍ وَّاَسْقَيْنَاكُمْ مَّآءً فُرَاتًا
আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি? অতঃপর আমি ওটাকে স্থাপন করেছি নিরাপদ স্থানে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। আমি একে গঠন করেছি সুবিন্যাস্তভাবে, অতএব আমি কতই না নিপুণ নিরূপণকারী! সেদিন মিথ্যারোপকারীদের জন্য দুর্ভোগ। আমি কি ভূমিকে জীবিত ও মৃতের জন্য বহনকারী রূপে সৃষ্টি করিনি? আমি তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় উচ্চ পর্বতমালা এবং তোমাদেরকে পান করিয়েছি সুপেয় পানি। (সূরা মুরসালাত, ২০-২৭)
বিশেষ চারটি জিনিসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَلَا يَنْظُرُوْنَ اِلَى الْاِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ ‐ - وَاِلَى السَّمَآءِ كَيْفَ رُفِعَتْ ‐ - وَاِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ ‐ - وَاِلَى الْاَ رْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
তারা কি উষ্ট্রপালের দিকে লক্ষ্য করে না যে, কীভাবে এগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে সমুচ্চ করা হয়েছে? পর্বতমালার দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে বসানো হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে (লক্ষ্য করে না যে) কীভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে? (সূরা গাশিয়া, ১৭-২০)
সুন্দর আকাশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَلَمْ يَنْظُرُوْاۤ اِلَى السَّمَآءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا وَزَيَّنَّاهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوْجٍ
এরা কি কখনো তাদের উপর অবস্থিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে, কীভাবে আমি তা তৈরি করেছি ও তাকে সুশোভীত করেছি? আর তাতে কোন (সূক্ষ্মতম) ফাটলও নেই। (সূরা ক্বাফ- ৬)
ব্যাখ্যা : এখানে আসমান বলতে পুরো ঊর্ধবজগতকে বুঝানো হয়েছে। যা মানুষ রাত-দিন তার মাথার উপর ছেয়ে থাকতে দেখে। যেখানে দিনের বেলা সূর্য দীপ্তি ছড়ায়, রাতের বেলা চাঁদ এবং অসংখ্য তারকারাজি উজ্জল হয়ে দেখা দেয়। মানুষ যদি এগুলোকে খালি চোখেই দেখে তাহলেও সে বিস্মিত হয়ে পড়ে। আর দুরবিন লাগিয়ে দেখলে এমন একটি বিশাল সুবিস্তৃত সৃষ্টিজগৎ তার সামনে ভেসে ওঠে, যার কোন সীমা নেই। কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ হয়েছে বুঝা যাবে না। আমাদের পৃথিবীর চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ বড় গ্রহসমূহ এর মধ্যে বলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের সূর্যের চেয়ে হাজার হাজার গুণ উজ্জল তারকা তার মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আমাদের এ সৌরজগৎ তার একটিমাত্র ছায়াপথের এক কোণে পড়ে আছে। আল্লাহর কর্তৃত্ব কত ব্যাপক ও বিস্তৃত আমরা তার কোন অনুমানই করতে পারি না। আল্লাহ তা‘আলা এ বিশাল সৃষ্টিজগতকে অস্তিত্বদান করেছেন।
মানুষ ও পশুর খাবারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَوَلَمْ يَرَوْا اَنَّا نَسُوْقُ الْمَآءَ اِلَى الْاَ رْضِ الْجُرُزِ فَنُخْرِجُ بِهٖ زَرْعًا تَاْكُلُ مِنْهُ اَنْعَامُهُمْ وَاَنْفُسُهُمْؕ اَفَلَا يُبْصِرُوْنَ
তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি শুষ্ক ও পতিত জমিনে পানি প্রবাহিত করি; তারপর তার সাহায্যে শস্য উৎপাদন করি। অতঃপর তা থেকে ভক্ষণ করে তাদের চতুষ্পদ (চার পা বিশিষ্ট) জন্তুরা এবং তারা নিজেরাও? তবে কি তারা দেখে না? (সূরা সাজদা- ২৭)
فَلْيَنْظُرِ الْاِنْسَانُ اِلٰى طَعَامِهٖ ‐ - اَنَّا صَبَبْنَا الْمَآءَ صَبًّا ‐ - ثُمَّ شَقَقْنَا الْاَ رْضَ شَقًّا ‐ - فَاَنْۢبَتْنَا فِيْهَا حَبًّا ‐ - وَّعِنَبًا وَّقَضْبًا ‐ - وَّزَيْتُوْنًا وَّنَخْلًا ‐ - وَّحَدَآئِقَ غُلْبًا ‐ - وَّفَاكِهَةً وَّاَبًّا ‐ - مَّتَاعًا لَّكُمْ وَلِاَنْعَامِكُمْ
মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমিই প্রচুর পানি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভূমিকে অদ্ভুতভাবে বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, যায়তুন, খেজুর, বহু নিবিড়-ঘন বাগান, ফল এবং গবাদি পশুর খাদ্য (ঘাস); তোমাদের ও তোমাদের পশুগুলোর ভোগের সামগ্রী হিসেবে। (সূরা আবাসা, ২৪-৩২)
মানুষের আয়ত্তাধীন পশুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَوَلَمْ يَرَوْا اَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِّمَّا عَمِلَتْ اَيْدِيْنَاۤ اَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُوْنَ ‐ - وَذَلَّلْنَاهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوْبُهُمْ وَمِنْهَا يَاْكُلُوْنَ ‐ - وَلَهُمْ فِيْهَا مَنَافِعُ وَمَشَارِبُ اَفَلَا يَشْكُرُوْنَ
তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, আমি তাদের জন্য সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্য থেকে চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে সৃষ্টি করেছি? অতঃপর তারা এগুলোর মালিক হয়। আর আমি এগুলোকে তাদের অনুগত করে দিয়েছি, ফলে তারা এদের কতগুলোকে তাদের বাহনে পরিণত করে এবং কতগুলোকে ভক্ষণ করে। তাদের জন্য এগুলোর মধ্যে রয়েছে আরো অনেক উপকারিতা এবং বিভিন্ন ধরনের পানীয়। তবুও কি তারা শুকরিয়া আদায় করবে না? (সূরা ইয়াসীন, ৭১-৭৩)
নানা রঙ্গের পাহাড়, মানুষ ও পশুপাখির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللهَ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخْرَجْنَا بِهٖ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا اَلْوَانُهَاؕ وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ ۢبِيْضٌ وَّحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ اَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُوْدٌ -‐ وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَآبِّ وَالْاَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ اَلْوَانُهٗ كَذٰلِكَؕ اِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَآءُؕ اِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ غَفُوْرٌ
তুমি কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। তারপর আমি তা দিয়ে নানা বর্ণের ফলমূল উৎপন্ন করি। আর পর্বতমালারও রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ- সাদা, লাল ও ঘোর কাল। আর এভাবে মানুষ, বিভিন্ন প্রাণী ও চতুষ্পদ জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপ্রতাপশালী ও পরম ক্ষমাশীল। (সূরা ফাতির- ২৭, ২৮)
ফসল উৎপাদনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمْ مَّا تَحْرُثُوْنَ ‐ - اَاَنْتُمْ تَزْرَعُوْنَهٗۤ اَمْ نَحْنُ الزَّارِعُوْنَ ‐ - لَوْ نَشَآءُ لَجَعَلْنَاهُ حُطَامًا فَظَلْتُمْ تَفَكَّهُوْنَ ‐ - اِنَّا لَمُغْرَمُوْنَ ‐ - بَلْ نَحْنُ مَحْرُوْمُوْنَ
তোমরা যে বীজ বপন কর সে বিষয়ে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি তা অংকুরিত কর, না আমি অংকুরিত করি? আমি ইচ্ছা করলে একে খড়কুটায় পরিণত করতে পারি। তখন তোমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, (বলবে) আমরা তো বরবাদ হয়ে গেছি! বরং আমরা বঞ্চিত। (সূরা ওয়াক্বিয়া, ৬৩-৬৭)
সুপেয় পানির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمُ الْمَآءَ الَّذِيْ تَشْرَبُوْنَ ‐ اَاَنْتُمْ اَنْزَلْتُمُوْهُ مِنَ الْمُزْنِ اَمْ نَحْنُ الْمُنْزِلُوْنَ ‐ - لَوْ نَشَآءُ جَعَلْنَاهُ اُجَاجًا فَلَوْلَا تَشْكُرُوْنَ
তোমরা যে পানি পান কর সে বিষয়ে চিন্তা করেছ কি? তোমরা কি তা মেঘ হতে বর্ষাও, না আমিই বর্ষাই। আমি ইচ্ছা করলে ওটাকে লবণাক্ত বানাতে পারি। তবুও কি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না? (সূরা ওয়াক্বিয়া, ৬৮-৭০)
আগুনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ :
اَفَرَاَيْتُمُ النَّارَ الَّتِيْ تُوْرُوْنَ ‐ - اَاَنْتُمْ اَنْشَاْتُمْ شَجَرَتَهَاۤ اَمْ نَحْنُ الْمُنْشِئُوْنَ
তোমরা যে আগুন জ্বালাও তা লক্ষ্য করে দেখেছ কি? তোমরাই কি তার বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি? (সূরা ওয়াক্বিয়া- ৭১,৭২)
ব্যাখ্যা : কুরআন মাজীদ মোট ছয় প্রকার নিদর্শনাবলির দিকে ইঙ্গিত করেছে। আর তা হলো :
১. যে নিদর্শনগুলো পৃথিবী থেকে নিয়ে আকাশ পর্যন্ত প্রত্যেকটি জিনিসের এবং বিশ্বজাহানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে পাওয়া যায়।
২. যে নিদর্শনগুলো মানুষের নিজের জন্ম এবং তার গঠনাকৃতি ও অস্তিত্বের মধ্যে পাওয়া যায়।
৩. যে নিদর্শনগুলো মানুষের অনুভূতিতে এবং তার নৈতিক চিন্তাধারায় পাওয়া যায়।
৪. যে নিদর্শনগুলো মানুষের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়।
৫. যে নিদর্শনাবলি মানুষের প্রতি অবতীর্ণ পার্থিব বিপদাপদ ও আসমানী বালা-মুসিবতের মধ্যে পাওয়া যায়।
৬. আল্লাহ তাঁর নবীগণের মাধ্যমে যেসব নিদর্শনাবলি প্রেরণ করেছেন সেগুলো।
মানুষকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর জন্য এসব নিদর্শনাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর সেসব নিদর্শনসমূহকে দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কান এবং চিন্তার জন্য অন্তরও দান করা হয়েছে। এ সমস্ত নিদর্শন মানুষকে এ কথা বলে যাচ্ছে যে, তোমার উপাস্য মাত্র একজন। তাঁর ইবাদাত ও আনুগত্য ছাড়া তোমার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। তোমাকে এ জগতে স্বাধীন, স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বহীন করে পাঠানো হয়নি। জীবনের সমস্ত কাজ শেষ করে তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে জবাবদিহি করতে হবে এবং সে কাজের প্রেক্ষিতে পুরস্কার বা শাস্তি পেতে হবে। কাজেই আল্লাহ তোমাকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী ও কিতাবসমূহ পাঠিয়ে যে পথনির্দেশনা দিয়েছেন তা মেনে চলো এবং স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত থাকো। এরপরও সে যদি সমস্ত নিদর্শনের দিক থেকে চোখ ও কান বন্ধ করে নেয় এবং মন-মস্তিষ্ক দিয়েও উল্টা বুঝে, তাহলে তার চেয়ে বড় যালিম আর কেউ হতে পারে না। দুনিয়ায় পরীক্ষার মেয়াদ শেষ করে যখন সে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন সে পুরস্কার লাভের সকল ধরনের যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলবে। ফলে সে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।