hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯৯

অধ্যায়- ৩ : অনুমতি চাওয়া

অন্যের ঘরে প্রবেশ করার সময় সালামের মাধ্যমে অনুমতি চাইতে হবে :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَدْخُلُوْا بُيُوْتًا غَيْرَ بُيُوْتِكُمْ حَتّٰى تَسْتَأْنِسُوْا وَتُسَلِّمُوْا عَلٰۤى اَهْلِهَا

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারো গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। (সূরা নূর- ২৭)

ব্যাখ্যা : অনুমতি চাওয়ার সবচেয়ে উত্তম নিয়ম হচ্ছে, যখন কোন ব্যক্তি কারো গৃহে অথবা আলোচনারত কোন জনসমষ্টিতে প্রবেশ করতে চাইবে তখন প্রথমে তার কাছে অনুমতি গ্রহণের জন্য এভাবে সম্ভোধন করবে - اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ اَاَدْخُلُ (আসসালামু আলাইকুম আআদখুলু) অর্থাৎ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমি কি প্রবেশ করতে পারি? এভাবে তিনবার সম্ভোধনের পরও যদি সাড়া না পাওয়া যায়, তবে ফিরে যাবে এবং অন্য কোন অসৎ উপায় গ্রহণ করবে না। নবী ﷺ বলেছেন, ‘‘যদি তিনবার ডাক দেয়ার পরও জবাব না পাওয়া যায়, তাহলে ফিরে যাও।’’ (আবু দাউদ, হা/৫১৭৯; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/১৭৩০; সহীহ মুসলিম, হা/৫৭৫১)

অনুমতি না পেলে ফিরে আসতে হবে :

فَاِنْ لَّمْ تَجِدُوْا فِيْهَاۤ اَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوْهَا حَتّٰى يُؤْذَنَ لَكُمْۚ وَاِنْ قِيْلَ لَكُمُ ارْجِعُوْا فَارْجِعُوْا هُوَ اَزْكٰى لَكُمْؕ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ

যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও তাহলে তাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ফিরে যাও, তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। (সূরা নূর- ২৮)

যেখানে সাধারণ অনুমতি আছে সেখানে প্রবেশ করা যাবে :

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ اَنْ تَدْخُلُوْا بُيُوْتًا غَيْرَ مَسْكُوْنَةٍ فِيْهَا مَتَاعٌ لَّكُمْؕ وَاللهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُوْنَ وَمَا تَكْتُمُوْنَ

যে গৃহে কেউ বসবাস করে না এবং যেখানে তোমাদের দ্রব্যসামগ্রী রয়েছে, সেখানে তোমাদের প্রবেশে কোন গোনাহ নেই। আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর আল্লাহ তা জানেন। (সূরা নূর- ২৯)

বালক-বালিকাদেরকেও তিনটি সময়ে অনুমতি নিতে হবে :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِيْنَ مَلَكَتْ اَيْمَانُكُمْ وَالَّذِيْنَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍؕ مِنْ قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِيْنَ تَضَعُوْنَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيْرَةِ وَمِنْ ۢبَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَآءِ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَّكُمْؕ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ ۢبَعْدَهُنَّؕ طَوَّافُوْنَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلٰى بَعْضٍؕ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمُ الْاٰيَاتِؕ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَكِيْمٌ

হে মুমিনগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিনটি সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের সালাতের পূর্বে, দ্বিপ্রহরে- যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখ এবং এশার সালাতের পর; এ তিনটি সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এ তিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে তোমাদের জন্য এবং তাদের জন্য কোন দোষ নেই। তোমাদের একজনকে অপরজনের নিকট তো যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নূর- ৫৮)

ব্যাখ্যা : এর অর্থ হচ্ছে এ সময়গুলোতে তোমরা একাকী বা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে এমন অবস্থায় থাক, যে অবস্থায় গৃহের ছেলেমেয়ে বা চাকর-বাকরদের হঠাৎ তোমাদের কাছে চলে আসা সংগত নয়। কাজেই এ তিন সময়ে তারা যখন তোমাদের নির্জন স্থানে আসতে চায়, তখন তাদেরকে অনুমতি নেয়ার নির্দেশ দাও। অর্থাৎ এ তিন সময় ছাড়া অন্য সময় নাবালেগ ছেলেমেয়েরা এবং গৃহস্বামী ও গৃহকর্ত্রীর মালিকানাধীন গোলাম ও বাঁদীরা সবসময় তাদের রুমে বা নির্জন স্থানে বিনা অনুমতিতে যেতে পারে। এ সময় যদি তোমরা কোন অসতর্ক অবস্থায় থাক এবং তারা অনুমতি ছাড়াই এসে যায়, তাহলে তাদের হুমকি ধমকি দেয়ার অধিকার তোমাদের নেই। কারণ কাজের সময় অসতর্ক অবস্থায় থাকা তোমাদের নিজেদেরই বোকামী। তবে যদি তোমরা তাদেরকে এ ব্যাপারে কোন আদব-কায়দা ও আচার-আচরণ শিক্ষা দিয়ে থাক এবং এরপরও তারা এ তিন সময়ের কোন এক সময় তোমাদের অনুমতি ছাড়াই এসে পড়ে, তাহলে তারা দোষী হবে।

তবে বালেগ হয়ে গেলে সবসময় অনুমতি নিতে হবে :

وَاِذَا بَلَغَ الْاَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوْا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ

তোমাদের সন্তান-সন্ততি প্রাপ্তবয়স্ক হলে তারাও যেন অনুমতি প্রার্থনা করে, যেমন অনুমতি প্রার্থনা করে থাকে তাদের পূর্ববর্তীরা। (সূরা নূর- ৫৯)

কারো ঘরে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে পালনীয় বিধান :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَدْخُلُوْا بُيُوْتَ النَّبِيِّ اِلَّاۤ اَنْ يُّؤْذَنَ لَكُمْ اِلٰى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِيْنَ اِنَاهُ وَلٰكِنْ اِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوْا فَاِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوْا وَلَا مُسْتَأْنِسِيْنَ لِحَدِيْثٍؕ اِنَّ ذٰلِكُمْ كَانَ يُؤْذِى النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيِيْ مِنْكُمْ وَاللهُ لَا يَسْتَحْيِيْ مِنَ الْحَقِّؕ وَاِذَا سَاَلْتُمُوْهُنَّ مَتَاعًا فَاسْاَلُوْهُنَّ مِنْ وَّرَآءِ حِجَابٍؕ ذٰلِكُمْ اَطْهَرُ لِقُلُوْبِكُمْ وَقُلُوْبِهِنَّؕ وَمَا كَانَ لَكُمْ اَنْ تُؤْذُوْا رَسُوْلَ اللهِ وَلَاۤ اَنْ تَنْكِحُوْاۤ اَزْوَاجَهٗ مِنْ ۢبَعْدِهۤ اَبَدًاؕ اِنَّ ذٰلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللهِ عَظِيْمًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর ঘরে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করবে না, তবে তোমাদেরকে খাওয়ার জন্য ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নবীকে কষ্ট দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচবোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর স্ত্রীদের কাছ থেকে কোনকিছু চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারো জন্য বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ। (সূরা আহযাব- ৫৩)

ব্যাখ্যা : নবী ﷺ এর পরিবারকে কেন্দ্র করে এ আয়াতে বেশ কয়েকটি সামাজিক আদব কায়দা শেখানো হয়েছে :

১. কারো ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়া।

২. অযথা খাওয়ার সময় কারো মেহমান না হওয়া।

৩. কারো ঘরে গেলে প্রয়োজন শেষে চলে আসা।

৪. নারীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাওয়া।

আরববাসীদের মধ্যে যেসব সভ্যতা বিবর্জিত আচরণের প্রচলন ছিল তার মধ্যে এটাও ছিল যে, কোন বন্ধু বা পরিচিত লোকের গৃহে তারা ঠিক খাবারের সময় পৌঁছে যেত। অথবা তার গৃহে এসে বসে থাকত এমনকি খাবার সময় এসে যেত। যখন যতজন লোকই আসুক সবসময় তৎক্ষনাৎ তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করার মতো সামর্থ্য সবাই রাখে না। আল্লাহ এ অভদ্র আচরণ করতে তাদেরকে নিষেধ করেন এবং এ হুকুম দেন যে, কোন ব্যক্তির গৃহে খাওয়ার জন্য তখনই যেতে হবে যখন গৃহকর্তা খাওয়ার দাওয়াত দেবে। এ হুকুম নবী ﷺ এর জন্য নির্দিষ্ট ছিল না বরং এটি ছিল সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নবী ﷺ এর গৃহে এ নিয়ম এজন্যই চালু করা হয়েছিল, যেন তা মুসলিমদের সাংস্কৃতিক জীবনে নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। তাদের আরো একটি অসভ্য আচরণ ছিল যে, কোন কোন লোক দাওয়াতে এসে খাওয়া সেরে এমনভাবে আলাপ জুড়ে দিত যে, মনে হয় এ আলাপ আর শেষ হবে না। এতে গৃহবাসীদের কোন অসুবিধা হচ্ছে কি না তার কোন পরোয়াই করত না। এসব ভদ্রতা বিবর্জিত আচরণ নবী ﷺ কে খুবই কষ্ট দিত, কিন্তু তিনি নিজের উদার স্বভাবের কারণে এসব সহ্য করে যেতেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা এ অভ্যাসগুলো সম্পর্কে লোকদেরকে সতর্ক করে আয়াত নাযিল করেন এবং এসব থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।