১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৫৭
অধ্যায়- ৪ : হুদহুদ পাখী ও বিলকিস সংক্রান্ত ঘটনা
একদিন হুদহুদ পাখী নিখোঁজ হয়ে যায় :
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَاۤ اَرَى الْهُدْهُدَۖ اَمْ كَانَ مِنَ الْغَآئِبِيْنَ ‐ لَاُعَذِّبَنَّهٗ عَذَابًا شَدِيْدًا اَوْ لَاَذْبَحَنَّهٗۤ اَوْ لَيَأْتِيَنِّيْ بِسُلْطَانٍ مُّبِيْنٍ
সুলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান নিল এবং বলল, ব্যাপার কী- হুদহুদকে দেখছি না কেন! সে অনুপস্থিত নাকি? সে উপযুক্ত কারণ না দেখালে আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা যবেহ করব। (সূরা নামল– ২০, ২১)
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সাবা থেকে একটি খবর নিয়ে এলো :
فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيْدٍ فَقَالَ اَحَطْتُّ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهٖ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَإٍ ۢبِنَبَإٍ يَّقِيْنٍ
অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা অবগত নন আমি তা অবগত হয়েছি এবং ‘সাবা’ হতে দৃঢ় সংবাদ নিয়ে এসেছি। (সূরা নামল– ২২)
সে সুলায়মান (আঃ) কে রাণী বিলকিসের অবস্থা শুনাল :
اِنِّيْ وَجَدْتُّ امْرَاَةً تَمْلِكُهُمْ وَاُوْتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَّلَهَا عَرْشٌ عَظِيْمٌ ‐ وَجَدْتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُوْنِ اللهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ اَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيْلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُوْنَ
আমি তো এক নারীকে দেখলাম, যে তাদের (প্রজাদের) উপর রাজত্ব করছে এবং তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে। আর তার এক বিরাট সিংহাসন রয়েছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলি তাদের নিকট সুশোভীত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ হতে নিবৃত্ত করে রেখেছে, ফলে তারা সৎপথ গ্রহণ করে না। (সূরা নামল– ২৩, ২৪)
সাবার লোকেরা আল্লাহকে সিজদা করত না :
اَلَّا يَسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِيْ يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِى السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُوْنَ وَمَا تُعْلِنُوْنَ ‐ اَللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ
(শয়তান বাধা দিয়ে রেখেছে এজন্য যে) যাতে তারা আল্লাহকে সিজদা করতে না পারে, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর লুকায়িত বস্তুকে প্রকাশ করে দেন। তিনি জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই, তিনি মহান আরশের অধিপতি। (সূরা নামল– ২৫, ২৬)
সুলায়মান (আঃ) হুদহুদ পাখীর সংবাদ যাচাই করতে লাগলেন :
قَالَ سَنَنْظُرُ اَصَدَقْتَ اَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَاذِبِيْنَ
সুলায়মান বলল, আমি দেখব তুমি কি সত্য বলেছ, নাকি তুমি মিথ্যাবাদী? (সূরা নামল– ২৭)
সুলায়মান (আঃ) বিলকিসের নিকট একটি চিঠি পাঠালেন :
اِذْهَبْ بِّكِتَابِيْ هٰذَا فَاَلْقِهْ اِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُوْنَ
তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং তাদের নিকট অর্পণ করো। অতঃপর তাদের নিকট হতে সরে থাকো এবং লক্ষ্য করো যে, তাদের প্রতিক্রিয়া কী? (সূরা নামল– ২৮)
চিঠি পেয়ে বিলকিস তার পরিষদবর্গকে তা জানাল :
قَالَتْ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَاُ اِنِّۤيْ اُلْقِيَ اِلَيَّ كِتَابٌ كَرِيْمٌ
সে (নারী) বলল, হে পরিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। (সূরা নামল– ২৯)
চিঠির মধ্যে যা লেখা ছিল :
اِنَّهٗ مِنْ سُلَيْمَانَ وَاِنَّهٗ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ ‐ اَلَّا تَعْلُوْا عَلَيَّ وَأْتُوْنِيْ مُسْلِمِيْنَ
নিশ্চয় এটা সুলায়মানের নিকট হতে আগত এবং এটা পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করা হয়েছে। (এতে লেখা আছে) সাবধান! তোমরা আমাকে অমান্য করো না এবং আনুগত্য স্বীকার করে আমার নিকট উপস্থিত হও। (সূরা নামল– ৩০, ৩১)
বিলকিস তার পরিষদবর্গের কাছে পরামর্শ চাইল :
قَالَتْ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَاُ اَفْتُوْنِيْ فِۤيْ اَمْرِيْۚ مَا كُنْتُ قَاطِعَةً اَمْرًا حَتّٰى تَشْهَدُوْنِ
সে (নারী) বলল, হে পরিষদবর্গ! আমার এ সমস্যায় তোমাদের অভিমত দাও। কারণ আমি কোন ব্যাপারে তোমাদের উপস্থিতি ব্যতীত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। (সূরা নামল– ৩২)
তারা নেত্রীকেই সিদ্ধান্ত নিতে বলল :
قَالُوْا نَحْنُ اُولُوْا قُوَّةٍ وَّاُولُوْا بَأْسٍ شَدِيْدٍ وَّالْاَمْرُ اِلَيْكِ فَانْظُرِيْ مَاذَا تَأْمُرِيْنَ
তারা বলল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করবেন তা আপনি ভেবে দেখুন। (সূরা নামল– ৩৩)
বিলকিস জবাব দিল :
قَالَتْ اِنَّ الْمُلُوْكَ اِذَا دَخَلُوْا قَرْيَةً اَفْسَدُوْهَا وَجَعَلُوْاۤ اَعِزَّةَ اَهْلِهَاۤ اَذِلَّةًۚ وَكَذٰلِكَ يَفْعَلُوْنَ
সে বলল, রাজা–বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদেরকে অপদস্থ করে, এরাও এরূপই করবে। (সূরা নামল– ৩৪)
বিলকিস পরীক্ষাস্বরূপ সুলায়মান (আঃ) কে হাদিয়া পাঠাল :
وَاِنِّيْ مُرْسِلَةٌ اِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ ۢبِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُوْنَ
আমি তাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি। দেখি, দূতেরা কী নিয়ে ফিরি আসে। (সূরা নামল- ৩৫)
সুলায়মান (আঃ) তার হাদিয়া গ্রহণ করেননি :
فَلَمَّا جَآءَ سُلَيْمَانَ قَالَ اَتُمِدُّوْنَنِ بِمَالٍؗ فَمَاۤ اٰتَانِيَ اللهُ خَيْرٌ مِّمَّاۤ اٰتَاكُمْۚ بَلْ اَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ
দূত সুলায়মানের নিকট আসলে সুলায়মান বলল, তোমরা কি আমাকে ধনসম্পদ দিয়ে সাহায্য করবে? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে উৎকৃষ্ট, অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে উৎফুল্ল বোধ কর। (সূরা নামল– ৩৬)
ব্যাখ্যা : অহংকার ও দাম্ভীকতার প্রকাশ এ কাজের উদ্দেশ্য নয়। আসল বক্তব্য হচ্ছে, তোমাদের অর্থ-সম্পদ আমার লক্ষ্য নয়; বরং তোমরা ঈমান আনো, এটাই আমার কাম্য। অথবা কমপক্ষে যে জিনিস আমি চাই তা হচ্ছে, তোমরা একটি সৎ জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসারী হয়ে যাও। এ দু’টি জিনিসের মধ্যে কোন একটিও যদি তোমরা না চাও, তাহলে ধনসম্পদের উপঢৌকন গ্রহণ করে তোমাদেরকে এ শিরক ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী নোংরা জীবনব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমাদের সম্পদের তুলনায় আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা অনেক বেশি। কাজেই তোমাদের সম্পদের প্রতি আমার লোভাতুর হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সুলায়মান (আঃ) ঐ দূতকে সতর্কবাণীসহ পাঠিয়ে দিলেন :
اِرْجِعْ اِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُوْدٍ لَّا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِجَنَّهُمْ مِّنْهَاۤ اَذِلَّةً وَّهُمْ صَاغِرُوْنَ
তুমি তাদের নিকট ফিরে যাও, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব, যার মুকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে সেখান থেকে লাঞ্ছিতভাবে বহিষ্কার করব; (পরিণামে) তারা সবাই অপমানিত হবে। (সূরা নামল– ৩৭)
সুলায়মান (আঃ) তাঁর পরিষদবর্গকে রাণীর সিংহাসন উঠিয়ে আনতে বললেন :
قَالَ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَأُ اَ يُّكُمْ يَأْتِيْنِيْ بِعَرْشِهَا قَبْلَ اَنْ يَّأْتُوْنِيْ مُسْلِمِيْنَ
সুলায়মান বললেন, হে আমার পরিষদবর্গ! তারা আত্মসমর্পণ করে আমার নিকট আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমার নিকট নিয়ে আসতে পারবে? (সূরা নামল– ৩৮)
এক জিন তা আনার দায়িত্ব নিল :
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ اَنَاْ اٰتِيْكَ بِهٖ قَبْلَ اَنْ تَقُوْمَ مِنْ مَّقَامِكَۚ وَاِنِّيْ عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ اَمِيْنٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান হতে উঠার পূর্বেই আমি সেটা এনে দেব এবং এ ব্যাপারে আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত ক্ষমতাবান। (সূরা নামল– ৩৯)
যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল সে মুহূর্তেই তা এনে দিল :
قَالَ الَّذِيْ عِنْدَهٗ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ اَنَاْ اٰتِيْكَ بِهٖ قَبْلَ اَنْ يَّرْتَدَّ اِلَيْكَ طَرْفُكَؕ فَلَمَّا رَاٰهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهٗ قَالَ هٰذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّيْ لِيَبْلُوَنِۤيْ اَاَشْكُرُ اَمْ اَكْفُرُؕ وَمَنْ شَكَرَ فَاِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهٖۚ وَمَنْ كَفَرَ فَاِنَّ رَبِّيْ غَنِيٌّ كَرِيْمٌ
যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল, সে বলল, আপনি চক্ষুর পলক ফেলার পূর্বেই আমি সেটা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন সেটা সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখল তখন বলল, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ? যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য এবং যে অকৃতজ্ঞ সে জেনে রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত ও মহানুভব। (সূরা নামল– ৪০)
সুলায়মান (আঃ) এটাকে একটু পরিবর্তন করলেন :
قَالَ نَكِّرُوْا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ اَتَهْتَدِيْۤ اَمْ تَكُوْنُ مِنَ الَّذِيْنَ لَا يَهْتَدُوْنَ
সুলায়মান বলল, তার সিংহাসনের আকৃতি অপরিচিত করে বদলিয়ে দাও। দেখি সে সঠিক দিশা পায়, নাকি সে বিভ্রান্তদের শামিল হয়। (সূরা নামল– ৪১)
বিলকিস আত্মসমর্পণ করে উপস্থিত হলো :
فَلَمَّا جَآءَتْ قِيْلَ اَهٰكَذَا عَرْشُكِؕ قَالَتْ كَاَنَّهٗ هُوَۚ وَاُوْتِيْنَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِيْنَ
অতঃপর যখন সে আসল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বলল, এটা তো সেটাই। ইতোপূর্বেই আমাদেরকে প্রকৃত জ্ঞান দান করা হয়েছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করেছি। (সূরা নামল– ৪২)
কাফির সমাজে থাকায় সে মুসলিম হতে পারেনি :
وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَّعْبُدُ مِنْ دُوْنِ اللهِؕ اِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِيْنَ
আল্লাহর পরিবর্তে সে যার পূজা করত, তাই তাকে সত্য হতে নিবৃত্ত করেছে। সে ছিল কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা নামল– ৪৩)
ব্যাখ্যা : এ বাক্যাংশটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অবস্থান সুস্পষ্ট করার জন্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে কোন জিদ ও একগুঁয়েমী ছিল না। শুধুমাত্র কাফির জাতির মধ্যে জন্ম নেয়ার কারণেই তিনি তখন পর্যন্ত কাফির ছিলেন। সচেতন বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী হওয়ার পর থেকেই যে জিনিসের সামনে সিজদানবত হওয়ার অভ্যাস তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেটিই ছিল তার প্রথম প্রতিবন্ধক। সুলায়মান (আঃ) এর মুখোমুখি হওয়ার পর যখন তার চোখ খুলে গেল তখন এ প্রতিবন্ধকতা দূর হতে দেরি হয়নি।
তাকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো ও মু‘জিযা দেখানো হলো :
قِيْلَ لَهَا ادْخُلِى الصَّرْحَۚ فَلَمَّا رَاَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَّكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَاؕ قَالَ اِنَّهٗ صَرْحٌ مُّمَرَّدٌ مِّنْ قَوَارِيْرَ
তাকে বলা হলো, এ প্রাসাদে প্রবেশ করো। অতঃপর যখন সে সেটা দেখল, তখন সে তাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ কাঁচমন্ডিত প্রাসাদ। (সূরা নামল– ৪৪)
অবশেষে বিলকিস ইসলাম গ্রহণ করল :
قَالَتْ رَبِّ اِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ وَاَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছিলাম। সুতরাং আমি সুলায়মানের সাথে জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। (সূরা নামল– ৪৪)
ব্যাখ্যা : সাবার রাণী ছিল আরবের ইতিহাসে বিপুল খ্যাতিমান ধনাঢ্য জাতির শাসক। একজন মানুষকে অহংকারে মত্ত করার জন্য যেসব উপকরণের প্রয়োজন তা সবই তার কাছে ছিল। যেসব জিনিসের জোরে একজন মানুষ অহংকারী হতে পারে তা কুরাইশ সরদারদের তুলনায় হাজার গুণ বেশি তার আয়ত্তাধীন ছিল। তাছাড়া সে ছিল একটি মুশরিক জাতির অন্তর্ভুক্ত। পিতৃপুরুষের অনুসরণের জন্য এবং নিজের জাতির মধ্যে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রাখার উদ্দেশ্যেও তার পক্ষে শিরক ত্যাগ করে তাওহীদের পথ অবলম্বন করা সাধারণ একজন মুশরিকের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল। কিন্তু যখনই তার সামনে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখনই সে সত্যকে গ্রহণ করে নিলো। কারণ তার মধ্যে যে ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তি ছিল তা নিছক একটি শিরকী পরিবেশে বসবাস করার ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার বিবেক আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি থেকে শূন্য ছিল না।
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَاۤ اَرَى الْهُدْهُدَۖ اَمْ كَانَ مِنَ الْغَآئِبِيْنَ ‐ لَاُعَذِّبَنَّهٗ عَذَابًا شَدِيْدًا اَوْ لَاَذْبَحَنَّهٗۤ اَوْ لَيَأْتِيَنِّيْ بِسُلْطَانٍ مُّبِيْنٍ
সুলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান নিল এবং বলল, ব্যাপার কী- হুদহুদকে দেখছি না কেন! সে অনুপস্থিত নাকি? সে উপযুক্ত কারণ না দেখালে আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা যবেহ করব। (সূরা নামল– ২০, ২১)
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সাবা থেকে একটি খবর নিয়ে এলো :
فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيْدٍ فَقَالَ اَحَطْتُّ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهٖ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَإٍ ۢبِنَبَإٍ يَّقِيْنٍ
অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা অবগত নন আমি তা অবগত হয়েছি এবং ‘সাবা’ হতে দৃঢ় সংবাদ নিয়ে এসেছি। (সূরা নামল– ২২)
সে সুলায়মান (আঃ) কে রাণী বিলকিসের অবস্থা শুনাল :
اِنِّيْ وَجَدْتُّ امْرَاَةً تَمْلِكُهُمْ وَاُوْتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَّلَهَا عَرْشٌ عَظِيْمٌ ‐ وَجَدْتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُوْنَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُوْنِ اللهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ اَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيْلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُوْنَ
আমি তো এক নারীকে দেখলাম, যে তাদের (প্রজাদের) উপর রাজত্ব করছে এবং তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে। আর তার এক বিরাট সিংহাসন রয়েছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলি তাদের নিকট সুশোভীত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ হতে নিবৃত্ত করে রেখেছে, ফলে তারা সৎপথ গ্রহণ করে না। (সূরা নামল– ২৩, ২৪)
সাবার লোকেরা আল্লাহকে সিজদা করত না :
اَلَّا يَسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِيْ يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِى السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُوْنَ وَمَا تُعْلِنُوْنَ ‐ اَللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ
(শয়তান বাধা দিয়ে রেখেছে এজন্য যে) যাতে তারা আল্লাহকে সিজদা করতে না পারে, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর লুকায়িত বস্তুকে প্রকাশ করে দেন। তিনি জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই, তিনি মহান আরশের অধিপতি। (সূরা নামল– ২৫, ২৬)
সুলায়মান (আঃ) হুদহুদ পাখীর সংবাদ যাচাই করতে লাগলেন :
قَالَ سَنَنْظُرُ اَصَدَقْتَ اَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَاذِبِيْنَ
সুলায়মান বলল, আমি দেখব তুমি কি সত্য বলেছ, নাকি তুমি মিথ্যাবাদী? (সূরা নামল– ২৭)
সুলায়মান (আঃ) বিলকিসের নিকট একটি চিঠি পাঠালেন :
اِذْهَبْ بِّكِتَابِيْ هٰذَا فَاَلْقِهْ اِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُوْنَ
তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং তাদের নিকট অর্পণ করো। অতঃপর তাদের নিকট হতে সরে থাকো এবং লক্ষ্য করো যে, তাদের প্রতিক্রিয়া কী? (সূরা নামল– ২৮)
চিঠি পেয়ে বিলকিস তার পরিষদবর্গকে তা জানাল :
قَالَتْ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَاُ اِنِّۤيْ اُلْقِيَ اِلَيَّ كِتَابٌ كَرِيْمٌ
সে (নারী) বলল, হে পরিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। (সূরা নামল– ২৯)
চিঠির মধ্যে যা লেখা ছিল :
اِنَّهٗ مِنْ سُلَيْمَانَ وَاِنَّهٗ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ ‐ اَلَّا تَعْلُوْا عَلَيَّ وَأْتُوْنِيْ مُسْلِمِيْنَ
নিশ্চয় এটা সুলায়মানের নিকট হতে আগত এবং এটা পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করা হয়েছে। (এতে লেখা আছে) সাবধান! তোমরা আমাকে অমান্য করো না এবং আনুগত্য স্বীকার করে আমার নিকট উপস্থিত হও। (সূরা নামল– ৩০, ৩১)
বিলকিস তার পরিষদবর্গের কাছে পরামর্শ চাইল :
قَالَتْ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَاُ اَفْتُوْنِيْ فِۤيْ اَمْرِيْۚ مَا كُنْتُ قَاطِعَةً اَمْرًا حَتّٰى تَشْهَدُوْنِ
সে (নারী) বলল, হে পরিষদবর্গ! আমার এ সমস্যায় তোমাদের অভিমত দাও। কারণ আমি কোন ব্যাপারে তোমাদের উপস্থিতি ব্যতীত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। (সূরা নামল– ৩২)
তারা নেত্রীকেই সিদ্ধান্ত নিতে বলল :
قَالُوْا نَحْنُ اُولُوْا قُوَّةٍ وَّاُولُوْا بَأْسٍ شَدِيْدٍ وَّالْاَمْرُ اِلَيْكِ فَانْظُرِيْ مَاذَا تَأْمُرِيْنَ
তারা বলল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করবেন তা আপনি ভেবে দেখুন। (সূরা নামল– ৩৩)
বিলকিস জবাব দিল :
قَالَتْ اِنَّ الْمُلُوْكَ اِذَا دَخَلُوْا قَرْيَةً اَفْسَدُوْهَا وَجَعَلُوْاۤ اَعِزَّةَ اَهْلِهَاۤ اَذِلَّةًۚ وَكَذٰلِكَ يَفْعَلُوْنَ
সে বলল, রাজা–বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদেরকে অপদস্থ করে, এরাও এরূপই করবে। (সূরা নামল– ৩৪)
বিলকিস পরীক্ষাস্বরূপ সুলায়মান (আঃ) কে হাদিয়া পাঠাল :
وَاِنِّيْ مُرْسِلَةٌ اِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ ۢبِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُوْنَ
আমি তাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি। দেখি, দূতেরা কী নিয়ে ফিরি আসে। (সূরা নামল- ৩৫)
সুলায়মান (আঃ) তার হাদিয়া গ্রহণ করেননি :
فَلَمَّا جَآءَ سُلَيْمَانَ قَالَ اَتُمِدُّوْنَنِ بِمَالٍؗ فَمَاۤ اٰتَانِيَ اللهُ خَيْرٌ مِّمَّاۤ اٰتَاكُمْۚ بَلْ اَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ
দূত সুলায়মানের নিকট আসলে সুলায়মান বলল, তোমরা কি আমাকে ধনসম্পদ দিয়ে সাহায্য করবে? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে উৎকৃষ্ট, অথচ তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে উৎফুল্ল বোধ কর। (সূরা নামল– ৩৬)
ব্যাখ্যা : অহংকার ও দাম্ভীকতার প্রকাশ এ কাজের উদ্দেশ্য নয়। আসল বক্তব্য হচ্ছে, তোমাদের অর্থ-সম্পদ আমার লক্ষ্য নয়; বরং তোমরা ঈমান আনো, এটাই আমার কাম্য। অথবা কমপক্ষে যে জিনিস আমি চাই তা হচ্ছে, তোমরা একটি সৎ জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসারী হয়ে যাও। এ দু’টি জিনিসের মধ্যে কোন একটিও যদি তোমরা না চাও, তাহলে ধনসম্পদের উপঢৌকন গ্রহণ করে তোমাদেরকে এ শিরক ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী নোংরা জীবনব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমাদের সম্পদের তুলনায় আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা অনেক বেশি। কাজেই তোমাদের সম্পদের প্রতি আমার লোভাতুর হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সুলায়মান (আঃ) ঐ দূতকে সতর্কবাণীসহ পাঠিয়ে দিলেন :
اِرْجِعْ اِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُوْدٍ لَّا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِجَنَّهُمْ مِّنْهَاۤ اَذِلَّةً وَّهُمْ صَاغِرُوْنَ
তুমি তাদের নিকট ফিরে যাও, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব, যার মুকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে সেখান থেকে লাঞ্ছিতভাবে বহিষ্কার করব; (পরিণামে) তারা সবাই অপমানিত হবে। (সূরা নামল– ৩৭)
সুলায়মান (আঃ) তাঁর পরিষদবর্গকে রাণীর সিংহাসন উঠিয়ে আনতে বললেন :
قَالَ يَاۤ اَيُّهَا الْمَلَأُ اَ يُّكُمْ يَأْتِيْنِيْ بِعَرْشِهَا قَبْلَ اَنْ يَّأْتُوْنِيْ مُسْلِمِيْنَ
সুলায়মান বললেন, হে আমার পরিষদবর্গ! তারা আত্মসমর্পণ করে আমার নিকট আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমার নিকট নিয়ে আসতে পারবে? (সূরা নামল– ৩৮)
এক জিন তা আনার দায়িত্ব নিল :
قَالَ عِفْرِيْتٌ مِّنَ الْجِنِّ اَنَاْ اٰتِيْكَ بِهٖ قَبْلَ اَنْ تَقُوْمَ مِنْ مَّقَامِكَۚ وَاِنِّيْ عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ اَمِيْنٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান হতে উঠার পূর্বেই আমি সেটা এনে দেব এবং এ ব্যাপারে আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত ক্ষমতাবান। (সূরা নামল– ৩৯)
যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল সে মুহূর্তেই তা এনে দিল :
قَالَ الَّذِيْ عِنْدَهٗ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ اَنَاْ اٰتِيْكَ بِهٖ قَبْلَ اَنْ يَّرْتَدَّ اِلَيْكَ طَرْفُكَؕ فَلَمَّا رَاٰهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهٗ قَالَ هٰذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّيْ لِيَبْلُوَنِۤيْ اَاَشْكُرُ اَمْ اَكْفُرُؕ وَمَنْ شَكَرَ فَاِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهٖۚ وَمَنْ كَفَرَ فَاِنَّ رَبِّيْ غَنِيٌّ كَرِيْمٌ
যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল, সে বলল, আপনি চক্ষুর পলক ফেলার পূর্বেই আমি সেটা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন সেটা সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখল তখন বলল, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ? যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য এবং যে অকৃতজ্ঞ সে জেনে রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত ও মহানুভব। (সূরা নামল– ৪০)
সুলায়মান (আঃ) এটাকে একটু পরিবর্তন করলেন :
قَالَ نَكِّرُوْا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ اَتَهْتَدِيْۤ اَمْ تَكُوْنُ مِنَ الَّذِيْنَ لَا يَهْتَدُوْنَ
সুলায়মান বলল, তার সিংহাসনের আকৃতি অপরিচিত করে বদলিয়ে দাও। দেখি সে সঠিক দিশা পায়, নাকি সে বিভ্রান্তদের শামিল হয়। (সূরা নামল– ৪১)
বিলকিস আত্মসমর্পণ করে উপস্থিত হলো :
فَلَمَّا جَآءَتْ قِيْلَ اَهٰكَذَا عَرْشُكِؕ قَالَتْ كَاَنَّهٗ هُوَۚ وَاُوْتِيْنَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِيْنَ
অতঃপর যখন সে আসল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বলল, এটা তো সেটাই। ইতোপূর্বেই আমাদেরকে প্রকৃত জ্ঞান দান করা হয়েছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করেছি। (সূরা নামল– ৪২)
কাফির সমাজে থাকায় সে মুসলিম হতে পারেনি :
وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَّعْبُدُ مِنْ دُوْنِ اللهِؕ اِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِيْنَ
আল্লাহর পরিবর্তে সে যার পূজা করত, তাই তাকে সত্য হতে নিবৃত্ত করেছে। সে ছিল কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা নামল– ৪৩)
ব্যাখ্যা : এ বাক্যাংশটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অবস্থান সুস্পষ্ট করার জন্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে কোন জিদ ও একগুঁয়েমী ছিল না। শুধুমাত্র কাফির জাতির মধ্যে জন্ম নেয়ার কারণেই তিনি তখন পর্যন্ত কাফির ছিলেন। সচেতন বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী হওয়ার পর থেকেই যে জিনিসের সামনে সিজদানবত হওয়ার অভ্যাস তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেটিই ছিল তার প্রথম প্রতিবন্ধক। সুলায়মান (আঃ) এর মুখোমুখি হওয়ার পর যখন তার চোখ খুলে গেল তখন এ প্রতিবন্ধকতা দূর হতে দেরি হয়নি।
তাকে প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো ও মু‘জিযা দেখানো হলো :
قِيْلَ لَهَا ادْخُلِى الصَّرْحَۚ فَلَمَّا رَاَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَّكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَاؕ قَالَ اِنَّهٗ صَرْحٌ مُّمَرَّدٌ مِّنْ قَوَارِيْرَ
তাকে বলা হলো, এ প্রাসাদে প্রবেশ করো। অতঃপর যখন সে সেটা দেখল, তখন সে তাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ কাঁচমন্ডিত প্রাসাদ। (সূরা নামল– ৪৪)
অবশেষে বিলকিস ইসলাম গ্রহণ করল :
قَالَتْ رَبِّ اِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ وَاَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছিলাম। সুতরাং আমি সুলায়মানের সাথে জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। (সূরা নামল– ৪৪)
ব্যাখ্যা : সাবার রাণী ছিল আরবের ইতিহাসে বিপুল খ্যাতিমান ধনাঢ্য জাতির শাসক। একজন মানুষকে অহংকারে মত্ত করার জন্য যেসব উপকরণের প্রয়োজন তা সবই তার কাছে ছিল। যেসব জিনিসের জোরে একজন মানুষ অহংকারী হতে পারে তা কুরাইশ সরদারদের তুলনায় হাজার গুণ বেশি তার আয়ত্তাধীন ছিল। তাছাড়া সে ছিল একটি মুশরিক জাতির অন্তর্ভুক্ত। পিতৃপুরুষের অনুসরণের জন্য এবং নিজের জাতির মধ্যে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রাখার উদ্দেশ্যেও তার পক্ষে শিরক ত্যাগ করে তাওহীদের পথ অবলম্বন করা সাধারণ একজন মুশরিকের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল। কিন্তু যখনই তার সামনে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখনই সে সত্যকে গ্রহণ করে নিলো। কারণ তার মধ্যে যে ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তি ছিল তা নিছক একটি শিরকী পরিবেশে বসবাস করার ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার বিবেক আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি থেকে শূন্য ছিল না।