১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৪৮
অধ্যায়- ২ : আখিরাতের প্রয়োজনীয়তা
বিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আখিরাত প্রয়োজন :
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِيْنَ – مَا خَلَقْنَاهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত কোনকিছুই খেলার জন্য সৃষ্টি করিনি। আমি এ দু’টি যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। (সূরা দুখান- ৩৮, ৩৯)
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّؕ وَاِنَّ السَّاعَةَ لَاٰتِيَةٌ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের অমত্মর্বর্তী কোনকিছুই আমি অযথা সৃষ্টি করিনি; নিশ্চয় কিয়ামতের আগমন ঘটবেই। (সূরা হিজর- ৮৫)
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَآءَ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًاؕ ذٰلِكَ ظَنُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَوَيْلٌ لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنَ النَّارِ
আর আমি আসমান-জমিন এবং উভয়ের মধ্যে অবস্থিত কোনকিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। (আমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেছি) এরূপ ধারণা তো তাদের, যারা কাফির। সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। (সূরা সোয়াদ- ২৭)
ব্যাখ্যা : এ বিশ্বজাহানকে যথার্থ সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা কোন শিশুর খেলা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। এর প্রতিটি অণু-পরমাণু এ কথারই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, একে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা সহকারে তৈরি করা হয়েছে। এর প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যে একটি আইন সক্রিয় রয়েছে। দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসের পেছনে সক্রিয় নিয়মনীতি উদ্ভাবন করে এবং প্রত্যেকটি বস্তু যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে তা অনুসন্ধান করেই মানুষ এখানে এ সবকিছু তৈরি করতে পেরেছে। এখন যে জ্ঞানবান সত্তা প্রজ্ঞার সাথে বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এর মধ্যে মানুষের মতো একটি সৃষ্টিকে সর্বপর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক শক্তি এবং ইখতিয়ার ও নৈতিক অনুভূতি দিয়ে দুনিয়ার অসংখ্য সাজ-সরঞ্জাম তার হাতে সঁপে দিয়েছেন, তিনি মানুষকে উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করেছেন- এ কথা কীভাবে সঠিক হতে পারে?
হক ও বাতিলপন্থীদেরকে জানার জন্য আখিরাত প্রয়োজন :
وَاَقْسَمُوْا بِاللهِ جَهْدَ اَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللهُ مَنْ يَّمُوْتُؕ بَلٰى وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ – لِيُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِيْ يَخْتَلِفُوْنَ فِيْهِ وَلِيَعْلَمَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْاۤ اَنَّهُمْ كَانُوْا كَاذِبِيْنَ
তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না। কেন নয়, (অবশ্যই তা করবেন) তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেনই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়- (তিনি পুনরুত্থিত করবেন) যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য, যাতে করে কাফিররা জানতে পারে যে, মূলত তারাই ছিল মিথ্যাবাদী। (সূরা নাহল- ৩৮, ৩৯)
পাপ-পুণ্যের পৃথক কর্মফল রয়েছে :
اَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًاؕ لَا يَسْتَوُوْنَ – اَمَّا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ جَنَّاتُ الْمَاْوٰىؗ نُزُلًا ۢبِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ – وَاَمَّا الَّذِيْنَ فَسَقُوْا فَمَاْوَاهُمُ النَّارُؕ كُلَّمَاۤ اَرَادُوْاۤ اَنْ يَّخْرُجُوْا مِنْهَاۤ اُعِيْدُوْا فِيْهَا وَقِيْلَ لَهُمْ ذُوْقُوْا عَذَابَ النَّارِ الَّذِيْ كُنْتُمْ بِهٖ تُكَذِّبُوْنَ
যে ব্যক্তি ঈমানদার সে কি ঐ ব্যক্তির সমকক্ষ হবে যে পাপাচারী? কখনই তারা সমান হতে পারে না। অতএব যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ চিরকালের বাসস্থান জান্নাত। আর যারা পাপকাজ করেছে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। যখনই তারা সেখান থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের যে আযাবকে অস্বীকার করতে তা এখন ভোগ করো। (সূরা সাজদা, ১৮-২০)
পাপ-পুণ্যের পৃথক ফলাফলের জন্য আখিরাত প্রয়োজন :
اَمْ نَجْعَلُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِيْنَ فِى الْاَ رْضِؗ اَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِيْنَ كَالْفُجَّارِ
যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং সৎকাজ করেছে, আমি কি তাদেরকে ঐসব লোকদের সমান করে দেব, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়? অথবা আমি কি মুত্তাক্বীদেরকে গোনাহগারদের সমান করে দেব? (সূরা সোয়াদ- ২৮)
ব্যাখ্যা : এ কথা সুস্পষ্ট যে, যদি আখিরাত না থাকত, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রকার জবাবদিহি না করা হতো এবং মানুষের সৎকাজের পুরস্কার ও অসৎকাজের শাস্তি না দেয়া হতো, তাহলে এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ইনসাফ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ত এবং বিশ্বের সমগ্র ব্যবস্থা একটি অরাজক ব্যবস্থায় পরিণত হতো। এ ধারণার ভিত্তিতে বিচার করলে দুনিয়ায় আদৌ সৎকাজের কোন উদ্যোক্তা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার জন্য কোন প্রতিবন্ধকতাই থাকত না। আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব যদি এমনি অরাজক ব্যাপার হয়, তাহলে এ পৃথিবীতে যে ব্যক্তি কষ্টভোগ করে নিজে সৎ জীবন-যাপন করে এবং মানুষের সংস্কার সাধনের কাজে আত্মনিয়োগ করে সে বড়ই নির্বোধ। আর যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে সবধরনের ফাসিকী ও অশ্লীল কার্যকলাপের মাধ্যমে আননদ উপভোগ করতে থাকে সেই বুদ্ধিমান (নাউযুবিল্লাহ)- এ জাতীয় চিন্তাধারা কখনো সঠিক হতে পারে না।
اَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِيْنَ كَالْمُجْرِمِيْنَ – مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ
আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মতো গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে? কেমন তোমাদের ফায়সালা? (সূরা ক্বালাম- ৩৫, ৩৬)
اَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ اَنْ نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَآءً مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَآءَ مَا يَحْكُمُوْنَ
পাপীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে তাদের মতোই গণ্য করব, যারা ঈমান আনয়ন করে ও সৎকাজ করে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ! (সূরা জাসিয়া- ২১)
ব্যাখ্যা : আখিরাত সত্য হওয়ার স্বপক্ষে এটা নৈতিক যুক্তি-প্রমাণ। নৈতিক চরিত্রের ভালো-মন্দ এবং কর্মের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের অনিবার্য দাবী হলো- ভালো এবং মন্দ লোকের পরিণাম এক হবে না, বরং সৎলোক তার সৎকাজের ভালো প্রতিদান লাভ করবে এবং অসৎলোক তার অসৎকাজের মন্দ ফল লাভ করবে। যদি তা না হয় এবং ভালো ও মন্দের ফলাফল একই রকম হয়, তাহলে ভালো ও মন্দের পার্থক্যই অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বেইনসাফীর অভিযোগ আরোপিত হয়। যারা পৃথিবীতে অন্যায়ের পথে চলে তারা তো অবশ্যই চাইবে, যেন কোন প্রকার প্রতিদান ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে। কিন্তু বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর ন্যায়বিচারের নীতির সাথে এটা আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয় শ্রেণির মানুষের সাথে একই রকম আচরণ করবেন এবং সৎকর্মশীল ঈমানদার ব্যক্তিগণ পৃথিবীতে কীভাবে জীবন-যাপন করেছে আর কাফির ও ফাসিক ব্যক্তিরা কী বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তার কিছুই দেখবেন না। এক ব্যক্তি সারা জীবন নিজেকে নৈতিকতার বিধি-বন্ধনে আবদ্ধ রাখল, প্রাপকদের প্রাপ্য দিল, অবৈধ স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখল এবং ন্যায় ও সত্যের জন্য নানা রকম ক্ষতি সহ্য করল; আরেক ব্যক্তি সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা পূর্ণ করল- সে না আল্লাহর অধিকার চিনল, না বান্দার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকল এবং স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ যেভাবে সম্ভব আহরণ করল। আল্লাহ এ দু’শ্রেণির মানুষের জীবনের এ পার্থক্য উপেক্ষা করবেন তা কি করে হতে পারে? মৃত্যু পর্যন্ত যাদের জীবন এক রকম হলো না, মৃত্যুর পর তাদের পরিণাম যদি একই রকম হয় তাহলে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় বেইনসাফী আর কী হতে পারে? অথচ আল্লাহ তা‘আলা বেইনসাফী করা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুতরাং পরকালে ভালো-মন্দের পরিণাম কখনই এক হবে না এবং হতেও পারে না। সৎলোকেরা যদি তাদের সৎকাজের পুরস্কার না পায় এবং যালিমদেরকে তাদের শাস্তি না দেয়া হয় তাহলে তা যুলুম হিসেবে গণ্য। আল্লাহর ব্যবস্থায় এ ধরনের যুলুম কখনো হতে পারে না। একইভাবে কোন সৎ মানুষকে তার প্রাপ্যের তুলনায় কম পুরস্কার দেয়া কিংবা কোন অসৎ মানুষকে তার প্রাপ্যের তুলনায় অধিক শাস্তি দেয়া- আল্লাহর বিচারে এ ধরনের কোন যুলুমও হতে পারে না।
وَخَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزٰى كُلُّ نَفْسٍ ۢبِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে, যাতে করে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। আর (কিয়ামতের দিন) তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না। (সূরা জাসিয়া- ২২)
ব্যাখ্যা : এ প্রয়োজনটির ভিত্তিতেই আল্লাহ মানুষকে পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। এ অপরিহার্য প্রয়োজন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোন পথেই পূর্ণ হতে পারে না। যারা আল্লাহকে নিজের একমাত্র রব হিসেবে মেনে নিয়ে সৎকাজ করবে, তারা নিজেদের এ যথার্থ কার্যধারার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করার অধিকার রাখে। অন্যদিকে যারা সত্য অস্বীকার করে বিরোধী অবস্থানে জীবন-যাপন করবে, তারাও নিজেদের এ ভ্রান্ত কার্যধারার কুফল প্রত্যক্ষ করবে। এ প্রয়োজন যদি পার্থিব জীবনে পূর্ণ না হয়, আর সবাই জানে যে, পূর্ণ হচ্ছে না; তাহলে অবশ্যই এটা পূর্ণ করার জন্য পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
اِنَّهٗ يَبْدَاُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيْدُهٗ لِيَجْزِيَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ بِالْقِسْطِ
তিনিই প্রথম সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন, অতঃপর তার পুনরাবর্তন ঘটান; যাতে করে তিনি মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণদেরকে ন্যায়বিচারের সাথে কর্মফল প্রদান করতে পারেন। (সূরা ইউনুস- ৪)
ব্যাখ্যা : মানুষের এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাকে পৃথিবীর অন্যান্য জিনিস থেকে আলাদা করে দেয়। আর তা হলো : (এক) পৃথিবী ও তার পরিবেশের অসংখ্য জিনিস তার বশীভূত করে দেয়া হয়েছে এবং তাকে সেগুলো ব্যবহার করার জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দান করা হয়েছে। (দুই) নিজের জীবনের পথ বেছে নেয়ার জন্য তাকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেয়া হয়েছে। ঈমান ও কুফরী, আনুগত্য ও বিদ্রোহ এবং সুকৃতি ও দুষ্কৃতির পথের মধ্য থেকে সত্য ও মিথ্যা এবং সঠিক ও বেঠিক যে কোন পথই সে অবলম্বন করতে পারে। (তিন) তার মধ্যে জন্মগতভাবে নৈতিকতার অনুভূতি রেখে দেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে যে, সৎকাজ পুরস্কার লাভের এবং অসৎকাজ শাস্তি লাভের যোগ্য হওয়া উচিত। মানুষের নিজের সত্তার মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়ার মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণ করে যে, এমন কোন সময় আসা উচিত যখন তাকে দুনিয়ায় যা কিছু দেয়া হয়েছিল তা ব্যবহার করার ক্ষমতাকে সে কীভাবে কাজে লাগিয়েছে? সে সঠিক পথ অবলম্বন করেছে, না ভুলপথ? এসব ঐচ্ছিক কার্যাবলি যাচাই করা হবে এবং সৎকাজের পুরস্কার ও অসৎকাজের জন্য শাস্তি দেয়া হবে। এ কথা সুনিশ্চিত যে, মানুষের জীবনে কার্যাবলি শেষ হওয়ার এবং তার প্রতিক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পরই এ সময়টি আসতে পারে, তার আগে আসতে পারে না। তার এ সময়টি অবশ্যই এমন সময়ে আসা উচিত, যখন এক ব্যক্তি বা একটি জাতির নয় বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কোন ব্যক্তি বা জাতি নিজের কার্যাবলির মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে যেসব প্রভাব বিস্তার করে যায়, উক্ত ব্যক্তি বা জাতির মৃত্যুতে তার ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় না। তার রেখে যাওয়া ভালো বা মন্দের প্রভাবও তার আমলনামায় লিখিত হয়। এ প্রভাবগুলো যে পর্যন্ত না পুরোপুরি প্রকাশ হয়ে যায় সে পর্যন্ত ইনসাফ অনুযায়ী পুরোপুরি হিসাব-নিকাশ করা এবং পুরোপুরি পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া সম্ভব নয়?
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِيْنَ – مَا خَلَقْنَاهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত কোনকিছুই খেলার জন্য সৃষ্টি করিনি। আমি এ দু’টি যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। (সূরা দুখান- ৩৮, ৩৯)
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّؕ وَاِنَّ السَّاعَةَ لَاٰتِيَةٌ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের অমত্মর্বর্তী কোনকিছুই আমি অযথা সৃষ্টি করিনি; নিশ্চয় কিয়ামতের আগমন ঘটবেই। (সূরা হিজর- ৮৫)
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَآءَ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًاؕ ذٰلِكَ ظَنُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَوَيْلٌ لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنَ النَّارِ
আর আমি আসমান-জমিন এবং উভয়ের মধ্যে অবস্থিত কোনকিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। (আমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেছি) এরূপ ধারণা তো তাদের, যারা কাফির। সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। (সূরা সোয়াদ- ২৭)
ব্যাখ্যা : এ বিশ্বজাহানকে যথার্থ সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা কোন শিশুর খেলা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। এর প্রতিটি অণু-পরমাণু এ কথারই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, একে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা সহকারে তৈরি করা হয়েছে। এর প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যে একটি আইন সক্রিয় রয়েছে। দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসের পেছনে সক্রিয় নিয়মনীতি উদ্ভাবন করে এবং প্রত্যেকটি বস্তু যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে তা অনুসন্ধান করেই মানুষ এখানে এ সবকিছু তৈরি করতে পেরেছে। এখন যে জ্ঞানবান সত্তা প্রজ্ঞার সাথে বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এর মধ্যে মানুষের মতো একটি সৃষ্টিকে সর্বপর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক শক্তি এবং ইখতিয়ার ও নৈতিক অনুভূতি দিয়ে দুনিয়ার অসংখ্য সাজ-সরঞ্জাম তার হাতে সঁপে দিয়েছেন, তিনি মানুষকে উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করেছেন- এ কথা কীভাবে সঠিক হতে পারে?
হক ও বাতিলপন্থীদেরকে জানার জন্য আখিরাত প্রয়োজন :
وَاَقْسَمُوْا بِاللهِ جَهْدَ اَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللهُ مَنْ يَّمُوْتُؕ بَلٰى وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ – لِيُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِيْ يَخْتَلِفُوْنَ فِيْهِ وَلِيَعْلَمَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْاۤ اَنَّهُمْ كَانُوْا كَاذِبِيْنَ
তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না। কেন নয়, (অবশ্যই তা করবেন) তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেনই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়- (তিনি পুনরুত্থিত করবেন) যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য, যাতে করে কাফিররা জানতে পারে যে, মূলত তারাই ছিল মিথ্যাবাদী। (সূরা নাহল- ৩৮, ৩৯)
পাপ-পুণ্যের পৃথক কর্মফল রয়েছে :
اَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًاؕ لَا يَسْتَوُوْنَ – اَمَّا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ جَنَّاتُ الْمَاْوٰىؗ نُزُلًا ۢبِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ – وَاَمَّا الَّذِيْنَ فَسَقُوْا فَمَاْوَاهُمُ النَّارُؕ كُلَّمَاۤ اَرَادُوْاۤ اَنْ يَّخْرُجُوْا مِنْهَاۤ اُعِيْدُوْا فِيْهَا وَقِيْلَ لَهُمْ ذُوْقُوْا عَذَابَ النَّارِ الَّذِيْ كُنْتُمْ بِهٖ تُكَذِّبُوْنَ
যে ব্যক্তি ঈমানদার সে কি ঐ ব্যক্তির সমকক্ষ হবে যে পাপাচারী? কখনই তারা সমান হতে পারে না। অতএব যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ চিরকালের বাসস্থান জান্নাত। আর যারা পাপকাজ করেছে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। যখনই তারা সেখান থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের যে আযাবকে অস্বীকার করতে তা এখন ভোগ করো। (সূরা সাজদা, ১৮-২০)
পাপ-পুণ্যের পৃথক ফলাফলের জন্য আখিরাত প্রয়োজন :
اَمْ نَجْعَلُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِيْنَ فِى الْاَ رْضِؗ اَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِيْنَ كَالْفُجَّارِ
যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং সৎকাজ করেছে, আমি কি তাদেরকে ঐসব লোকদের সমান করে দেব, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়? অথবা আমি কি মুত্তাক্বীদেরকে গোনাহগারদের সমান করে দেব? (সূরা সোয়াদ- ২৮)
ব্যাখ্যা : এ কথা সুস্পষ্ট যে, যদি আখিরাত না থাকত, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রকার জবাবদিহি না করা হতো এবং মানুষের সৎকাজের পুরস্কার ও অসৎকাজের শাস্তি না দেয়া হতো, তাহলে এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ইনসাফ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ত এবং বিশ্বের সমগ্র ব্যবস্থা একটি অরাজক ব্যবস্থায় পরিণত হতো। এ ধারণার ভিত্তিতে বিচার করলে দুনিয়ায় আদৌ সৎকাজের কোন উদ্যোক্তা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার জন্য কোন প্রতিবন্ধকতাই থাকত না। আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব যদি এমনি অরাজক ব্যাপার হয়, তাহলে এ পৃথিবীতে যে ব্যক্তি কষ্টভোগ করে নিজে সৎ জীবন-যাপন করে এবং মানুষের সংস্কার সাধনের কাজে আত্মনিয়োগ করে সে বড়ই নির্বোধ। আর যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে সবধরনের ফাসিকী ও অশ্লীল কার্যকলাপের মাধ্যমে আননদ উপভোগ করতে থাকে সেই বুদ্ধিমান (নাউযুবিল্লাহ)- এ জাতীয় চিন্তাধারা কখনো সঠিক হতে পারে না।
اَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِيْنَ كَالْمُجْرِمِيْنَ – مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُوْنَ
আমি কি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মতো গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে? কেমন তোমাদের ফায়সালা? (সূরা ক্বালাম- ৩৫, ৩৬)
اَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ اَنْ نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَآءً مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَآءَ مَا يَحْكُمُوْنَ
পাপীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে তাদের মতোই গণ্য করব, যারা ঈমান আনয়ন করে ও সৎকাজ করে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ! (সূরা জাসিয়া- ২১)
ব্যাখ্যা : আখিরাত সত্য হওয়ার স্বপক্ষে এটা নৈতিক যুক্তি-প্রমাণ। নৈতিক চরিত্রের ভালো-মন্দ এবং কর্মের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যের অনিবার্য দাবী হলো- ভালো এবং মন্দ লোকের পরিণাম এক হবে না, বরং সৎলোক তার সৎকাজের ভালো প্রতিদান লাভ করবে এবং অসৎলোক তার অসৎকাজের মন্দ ফল লাভ করবে। যদি তা না হয় এবং ভালো ও মন্দের ফলাফল একই রকম হয়, তাহলে ভালো ও মন্দের পার্থক্যই অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বেইনসাফীর অভিযোগ আরোপিত হয়। যারা পৃথিবীতে অন্যায়ের পথে চলে তারা তো অবশ্যই চাইবে, যেন কোন প্রকার প্রতিদান ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে। কিন্তু বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর ন্যায়বিচারের নীতির সাথে এটা আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয় শ্রেণির মানুষের সাথে একই রকম আচরণ করবেন এবং সৎকর্মশীল ঈমানদার ব্যক্তিগণ পৃথিবীতে কীভাবে জীবন-যাপন করেছে আর কাফির ও ফাসিক ব্যক্তিরা কী বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তার কিছুই দেখবেন না। এক ব্যক্তি সারা জীবন নিজেকে নৈতিকতার বিধি-বন্ধনে আবদ্ধ রাখল, প্রাপকদের প্রাপ্য দিল, অবৈধ স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখল এবং ন্যায় ও সত্যের জন্য নানা রকম ক্ষতি সহ্য করল; আরেক ব্যক্তি সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা পূর্ণ করল- সে না আল্লাহর অধিকার চিনল, না বান্দার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকল এবং স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ যেভাবে সম্ভব আহরণ করল। আল্লাহ এ দু’শ্রেণির মানুষের জীবনের এ পার্থক্য উপেক্ষা করবেন তা কি করে হতে পারে? মৃত্যু পর্যন্ত যাদের জীবন এক রকম হলো না, মৃত্যুর পর তাদের পরিণাম যদি একই রকম হয় তাহলে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় বেইনসাফী আর কী হতে পারে? অথচ আল্লাহ তা‘আলা বেইনসাফী করা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুতরাং পরকালে ভালো-মন্দের পরিণাম কখনই এক হবে না এবং হতেও পারে না। সৎলোকেরা যদি তাদের সৎকাজের পুরস্কার না পায় এবং যালিমদেরকে তাদের শাস্তি না দেয়া হয় তাহলে তা যুলুম হিসেবে গণ্য। আল্লাহর ব্যবস্থায় এ ধরনের যুলুম কখনো হতে পারে না। একইভাবে কোন সৎ মানুষকে তার প্রাপ্যের তুলনায় কম পুরস্কার দেয়া কিংবা কোন অসৎ মানুষকে তার প্রাপ্যের তুলনায় অধিক শাস্তি দেয়া- আল্লাহর বিচারে এ ধরনের কোন যুলুমও হতে পারে না।
وَخَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزٰى كُلُّ نَفْسٍ ۢبِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে, যাতে করে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। আর (কিয়ামতের দিন) তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না। (সূরা জাসিয়া- ২২)
ব্যাখ্যা : এ প্রয়োজনটির ভিত্তিতেই আল্লাহ মানুষকে পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। এ অপরিহার্য প্রয়োজন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোন পথেই পূর্ণ হতে পারে না। যারা আল্লাহকে নিজের একমাত্র রব হিসেবে মেনে নিয়ে সৎকাজ করবে, তারা নিজেদের এ যথার্থ কার্যধারার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করার অধিকার রাখে। অন্যদিকে যারা সত্য অস্বীকার করে বিরোধী অবস্থানে জীবন-যাপন করবে, তারাও নিজেদের এ ভ্রান্ত কার্যধারার কুফল প্রত্যক্ষ করবে। এ প্রয়োজন যদি পার্থিব জীবনে পূর্ণ না হয়, আর সবাই জানে যে, পূর্ণ হচ্ছে না; তাহলে অবশ্যই এটা পূর্ণ করার জন্য পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
اِنَّهٗ يَبْدَاُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيْدُهٗ لِيَجْزِيَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ بِالْقِسْطِ
তিনিই প্রথম সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন, অতঃপর তার পুনরাবর্তন ঘটান; যাতে করে তিনি মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণদেরকে ন্যায়বিচারের সাথে কর্মফল প্রদান করতে পারেন। (সূরা ইউনুস- ৪)
ব্যাখ্যা : মানুষের এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাকে পৃথিবীর অন্যান্য জিনিস থেকে আলাদা করে দেয়। আর তা হলো : (এক) পৃথিবী ও তার পরিবেশের অসংখ্য জিনিস তার বশীভূত করে দেয়া হয়েছে এবং তাকে সেগুলো ব্যবহার করার জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দান করা হয়েছে। (দুই) নিজের জীবনের পথ বেছে নেয়ার জন্য তাকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেয়া হয়েছে। ঈমান ও কুফরী, আনুগত্য ও বিদ্রোহ এবং সুকৃতি ও দুষ্কৃতির পথের মধ্য থেকে সত্য ও মিথ্যা এবং সঠিক ও বেঠিক যে কোন পথই সে অবলম্বন করতে পারে। (তিন) তার মধ্যে জন্মগতভাবে নৈতিকতার অনুভূতি রেখে দেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে যে, সৎকাজ পুরস্কার লাভের এবং অসৎকাজ শাস্তি লাভের যোগ্য হওয়া উচিত। মানুষের নিজের সত্তার মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়ার মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণ করে যে, এমন কোন সময় আসা উচিত যখন তাকে দুনিয়ায় যা কিছু দেয়া হয়েছিল তা ব্যবহার করার ক্ষমতাকে সে কীভাবে কাজে লাগিয়েছে? সে সঠিক পথ অবলম্বন করেছে, না ভুলপথ? এসব ঐচ্ছিক কার্যাবলি যাচাই করা হবে এবং সৎকাজের পুরস্কার ও অসৎকাজের জন্য শাস্তি দেয়া হবে। এ কথা সুনিশ্চিত যে, মানুষের জীবনে কার্যাবলি শেষ হওয়ার এবং তার প্রতিক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পরই এ সময়টি আসতে পারে, তার আগে আসতে পারে না। তার এ সময়টি অবশ্যই এমন সময়ে আসা উচিত, যখন এক ব্যক্তি বা একটি জাতির নয় বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কোন ব্যক্তি বা জাতি নিজের কার্যাবলির মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে যেসব প্রভাব বিস্তার করে যায়, উক্ত ব্যক্তি বা জাতির মৃত্যুতে তার ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় না। তার রেখে যাওয়া ভালো বা মন্দের প্রভাবও তার আমলনামায় লিখিত হয়। এ প্রভাবগুলো যে পর্যন্ত না পুরোপুরি প্রকাশ হয়ে যায় সে পর্যন্ত ইনসাফ অনুযায়ী পুরোপুরি হিসাব-নিকাশ করা এবং পুরোপুরি পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া সম্ভব নয়?