hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩১৬

পর্ব- ৩৮ : জিন অধ্যায়- ১ : জিন জাতির পরিচয়

জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে :

وَخَلَقَ الْجَآنَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ

আর আল্লাহ জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নিশিখা হতে। (সূরা আর রহমান- ১৫)

ব্যাখ্যা : نَارٌ (নার) অর্থ এক বিশেষ ধরনের আগুন। কাঠ বা কয়লা জ্বালালে যে আগুন সৃষ্টি হয় এটা সে আগুন নয়। আর مَارِجٌ (মারিজ) অর্থ ধোঁয়াবিহীন শিখা। প্রথম মানুষকে যেভাবে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তারপর সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করার সময় তার মাটির সত্তা অস্তিমাংসে তৈরি জীবন্ত মানুষের আকৃতি লাভ করেছে এবং পরবর্তী সময়ে শুক্রের সাহায্যে তার বংশধারা চালু হয়েছে: অনুরূপ প্রথম জিনকে নিছক আগুনের শিখা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং তার বংশধরদের থেকে পরবর্তী জিনদের বংশধারা সৃষ্টি হয়ে চলেছে।

ইবলিস জিনদের অন্তর্ভুক্ত :

وَاِذْ قُلْنَا لِلْمَلَآئِكَةِ اسْجُدُوْا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوْاۤ اِلَّاۤ اِبْلِيْسَؕ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ اَمْرِ رَبِّهٖؕ اَفَتَتَّخِذُوْنَهٗ وَذُرِّيَّتَهٗۤ اَوْلِيَآءَ مِنْ دُوْنِيْ وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ ؕ بِئْسَ لِلظَّالِمِيْنَ بَدَلًا

স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। (মূলত) সে ছিল জিনদের মধ্যে একজন, সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। তবুও কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। যালিমদের জন্য এ বিনিময় কতই না নিকৃষ্ট। (সূরা কাহফ- ৫০)

ব্যাখ্যা : ইবলিস ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল না বরং সে ছিল জিনদের একজন। তাই তার পক্ষে আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে জিন হচ্ছে, মানুষের মতো একটি স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন সৃষ্টি। তাদেরকে জন্মগতভাবে আনুগত্যশীল হিসেবে সৃষ্টি করা হয়নি। বরং তাদেরকে কুফর ও ঈমান এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতা উভয়টি করার ক্ষমতা দান করা হয়েছে। এ সত্যটিই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইবলিস ছিল জিনদের দলভুক্ত। তাই সে স্বেচ্ছায় নিজের স্বাধীন ক্ষমতা ব্যবহার করে ফাসিকীর পথ বাছাই করে নেয়। এ আয়াতটি লোকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এক ধরনের ভুল ধারণা দূর করে দেয়। আর সে ভুল ধারণাটি হচ্ছে, ইবলিস ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল। তাও আবার সাধারণ ফেরেশতা নয়, ফেরেশতাদের সরদার।

জিনদের মধ্যে সৎ এবং অসৎ উভয় রয়েছে :

وَاَنَّا مِنَّا الصَّالِحُوْنَ وَمِنَّا دُوْنَ ذٰلِكَ كُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا

আমাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। (সূরা জিন- ১১)

তাদের মধ্যে যারা মুসলিম তারা জান্নাতবাসী হবে :

وَاَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُوْنَ وَمِنَّا الْقَاسِطُوْنَ فَمَنْ اَسْلَمَ فَاُولٰٓئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا

আমাদের কতক মুসলিম এবং কতক অত্যাচারী, তবে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। (সূরা জিন- ১৪)

যারা মুসলিম নয় তারা জাহান্নামে জ্বলবে :

وَاَمَّا الْقَاسِطُوْنَ فَكَانُوْا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا

অপরপক্ষে অত্যাচারীরা তো জাহান্নামের ইন্ধন। (সূরা জিন- ১৫)

وَلَقَدْ ذَرَاْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْاِنْسِ لَهُمْ قُلُوْبٌ لَّا يَفْقَهُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ اَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ اٰذَانٌ لَّا يَسْمَعُوْنَ بِهَا اُولٰٓئِكَ كَالْاَنْعَامِ بَلْ هُمْ اَضَلُّ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْغَافِلُوْنَ

আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করতে পারে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা দেখতে পারে না এবং তাদের কর্ণ আছে কিন্তু তারা তা দ্বারা শ্রবণ করতে পারে না। তারাই পশুর ন্যায়, বরং তারা (আরো) অধিক বিভ্রান্ত এবং তারাই গাফিল। (সূরা আ‘রাফ- ১৭৯)

মানুষের মতো জিনদের উপরও আল্লাহর বিধান প্রযোজ্য :

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ

আমি জিন ও মানুষকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে। (সূরা যারিয়াত- ৫)

জিনদেরকেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে :

يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْاِنْسِ اَلَمْ يَاْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنْكُمْ يَقُصُّوْنَ عَلَيْكُمْ اٰيَاتِيْ وَيُنْذِرُوْنَكُمْ لِقَآءَ يَوْمِكُمْ هٰذَا قَالُوْا شَهِدْنَا عَلٰۤى اَنْفُسِنَا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوْا عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ اَنَّهُمْ كَانُوْا كَافِرِيْنَ

হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য হতে কি রাসূলগণ তোমাদের কাছে আসেনি, যারা আমার নিদর্শন তোমাদের নিকট বর্ণনা করত এবং তোমাদেরকে এ দিবসের সম্মুখীন হওয়া সম্বন্ধে সতর্ক করত? তারা বলবে, আমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলাম। বস্তুত পার্থিব জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে এ সাক্ষ্য দেবে। নিশ্চয় তারা (ইতোপূর্বে) কাফিরদের অমত্মর্ভূক্ত ছিল। (সূরা আন‘আম- ১৩০)

অনেকে জিনকে আল্লাহর শরীক মনে করে :

وَجَعَلُوْا لِلّٰهِ شُرَكَآءَ الْجِنَّ وَخَلَقَهُمْ وَخَرَقُوْا لَهٗ بَنِيْنَ وَبَنَاتٍ ۢبِغَيْرِ عِلْمٍ سُبْحَانَهٗ وَتَعَالٰى عَمَّا يَصِفُوْنَ

তারা জিনকে আল্লাহর শরীক স্থাপন করে, অথচ তিনিই এদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর প্রতি পুত্র ও কন্যাসমত্মান আরোপ করে; কিন্তু তিনি (এগুলো হতে) অনেক পবিত্র ও মহিমান্বিত। আর তারা (তাঁকে) যেভাবে গুণান্বিত করে তিনি তা হতে অনেক ঊর্ধ্বে। (সূরা আন‘আম- ১০০)

কিছু মানুষ জিনের আশ্রয় গ্রহণ করে :

كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْاِنْسِ يَعُوْذُوْنَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوْهُمْ رَهَقًا

আর কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করে, ফলে তারা নিজেদের সীমালঙ্ঘন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। (সূরা জিন- ৬)