hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩১

অধ্যায়- ৯ : কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য

মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য :

كِتَابٌ اَنْزَلْنَاهُ اِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ اِلَى النُّوْرِ بِاِذْنِ رَبِّهِمْ اِلٰى صِرَاطِ الْعَزِيْزِ الْحَمِيْدِ

এ কিতাব তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যেন তুমি মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আনতে পার; মহাপরাক্রমশালী ও প্রশংসিত আল্লাহর পথে। (সূরা ইবরাহীম- ১)

هُوَ الَّذِيْ يُنَزِّلُ عَلٰى عَبْدِهٖۤ اٰيَاتٍ ۢبَيِّنَاتٍ لِّيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمَاتِ اِلَى النُّوْرِؕ وَاِنَّ اللهَ بِكُمْ لَرَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ

তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময় ও পরম দয়ালু। (সূরা হাদীদ- ৯)

ব্যাখ্যা : কুরআনের মধ্যে আছে অন্তর্দৃষ্টির আলো। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যারা একে মেনে নেয় তারা সঠিক পথ পেয়ে যায়। অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনার অর্থ হচ্ছে, শয়তানের পথ থেকে সরিয়ে আল্লাহর পথে নিয়ে আসা। অন্য কথায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নেই সে আসলে অজ্ঞতা ও মূর্খতার অন্ধকারে বিভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে নিজেকে যতই উন্নত চিন্তার অধিকারী এবং জ্ঞানী মনে করুক না কেন তাতে আসল অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথের সন্ধান পেয়েছে, একজন অশিক্ষিত লোক হলেও সে আসলে জ্ঞানের আলোর রাজ্যে পৌঁছে গেছে।

মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য :

كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمْ اٰيَاتِهٖ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ

এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ তোমাদের সামনে বর্ণনা করেন, যাতে করে তোমরা হেদায়াত লাভ করতে পার। (সূরা আলে ইমরান- ১০৩)

মানুষকে পথভ্রষ্টতার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য :

يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمْ اَنْ تَضِلُّوْاؕ وَاللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمٌ

তোমরা পথভ্রষ্ট হবে- (এ আশঙ্কায়) আল্লাহ তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে (সবকিছু) জানিয়ে দিয়েছেন; আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবহিত। (সূরা নিসা- ১৭৬)

يٰسٓ ‐ وَالْقُرْاٰنِ الْحَكِيْمِ – - اِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِيْنَ -‐ عَلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ – -تَنْزِيْلَ الْعَزِيْزِ الرَّحِيْمِ – - لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّاۤ اُنْذِرَ اٰبَآؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُوْنَ

ইয়া-সীন। বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ। নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত। আপনি সরলসঠিক পথের উপর আছেন। এ কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে প্রবল প্রতাপশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে। যেন আপনি এমন লোকদেরকে সতর্ক করেন, যাদের পূর্বপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা গাফিল রয়ে গেছে। (সূরা ইয়াসীন, ১-৬)

মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য :

اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَاۤ اَرَاكَ اللهُ

আমি তো তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন সে অনুসারে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দিতে পার। (সূরা নিসা- ১০৫)

বিভিন্ন মতভেদের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য :

وَمَاۤ اَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ اِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِى اخْتَلَفُوْا فِيْهِ وَهُدًى وَّرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُّؤْمِنُوْنَ

আমি তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি- যারা এ বিষয়ে মতভেদ করে তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য; আর এটা মুমিনদের জন্য পথনির্দেশ ও রহমত। (সূরা নাহল- ৬৪)

পাপের পথ কোনটি তা পরিষ্কার করে দেয়ার জন্য :

وَكَذٰلِكَ نُفَصِّلُ الْاٰيَاتِ وَلِتَسْتَبِيْنَ سَبِيْلُ الْمُجْرِمِيْنَ

এভাবে আমি আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি; যাতে করে অপরাধীদের পথ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। (সূরা আন‘আম- ৫৫)

মানুষকে আখিরাতের ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য :

وَكَذٰلِكَ اَوْحَيْنَاۤ اِلَيْكَ قُرْاٰنًا عَرَبِيًّا لِّتُنْذِرَ اُمَّ الْقُرٰى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيْهِ

এভাবে আমি তোমার প্রতি আরবি ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি সতর্ক করতে পার মক্কা ও তার আশপাশের জনগণকে এবং সতর্ক করতে পার কিয়ামত দিবস সম্পর্কে, যে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। (সূরা শূরা- ৭)

يُلْقِى الرُّوْحَ مِنْ اَمْرِهٖ عَلٰى مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ

তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার প্রতি স্বীয় আদেশসহ রূহ (ওহী) প্রেরণ করেন, যেন সে (মানুষদেরকে) সাক্ষাৎ দিবস (কিয়ামত) সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে। (সূরা মু’মিন- ১৫)

ব্যাখ্যা : নবুওয়াতের এ রূহ বা প্রাণসত্তায় উজ্জীবিত হয়েই নবীগণ দাওয়াতী কাজ করেন ও কথা বলেন। স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক জীবনে প্রাণের যে মর্যাদা এ ওহী ও নবুওয়াতী প্রাণসত্তা নৈতিক জীবনে একই মর্যাদার অধিকারী। তাই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার জন্য ‘রূহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবী ﷺ সেসব লোককে খারাপ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দাসত্ব করে নিজের প্রতি যুলুম করেছে।

সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দেয়া ও পাপীদেরকে ভয় দেখানোর জন্য :

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْۤ اَنْزَلَ عَلٰى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَلْ لَّهٗ عِوَجًا – - قَيِّمًا لِّيُنْذِرَ بَاْسًا شَدِيْدًا مِّنْ لَّدُنْهُ وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصَّالِحَاتِ اَنَّ لَهُمْ اَجْرًا حَسَنًا

সমসত্ম প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এ কিতাব তাঁর বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাতে কোন বক্রতা রাখেননি। তিনি একে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর কঠিন শাসিত্ম সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য এবং সৎকর্মশীল মুমিনদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার। (সূরা কাহফ- ১, ২)

ব্যাখ্যা : এ কিতাব সুসংবাদ দানকারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী। একে মেনে চলার ফলাফল অত্যন্ত শুভ এবং না মানার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসের কারণ। এ ধরনের গ্রন্থকে কেবল কোন নির্বোধই উপেক্ষা করতে পারে।

পরকালে মানুষের অভিযোগ তুলার পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য :

وَهٰذَا كِتَابٌ اَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوْهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ – - اَنْ تَقُوْلُوْاۤ اِنَّمَاۤ اُنْزِلَ الْكِتَابُ عَلٰى طَآئِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا وَاِنْ كُنَّا عَنْ دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِيْنَ – - اَوْ تَقُوْلُوْا لَوْ اَنَّاۤ اُنْزِلَ عَلَيْنَا الْكِتَابُ لَكُنَّاۤ اَهْدٰى مِنْهُمْ ۚ فَقَدْ جَآءَكُمْ بَيِّنَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌۚ فَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَّبَ بِاٰيَاتِ اللهِ وَصَدَفَ عَنْهَاؕ سَنَجْزِى الَّذِيْنَ يَصْدِفُوْنَ عَنْ اٰيَاتِنَا سُوْٓءَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوْا يَصْدِفُوْنَ

আমি এ কিতাব নাযিল করেছি যা কল্যাণময়। সুতরাং তার অনুসরণ করো এবং সাবধান হও, হয়তো তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হবে। যাতে করে পরবর্তীতে এ কথা বলতে না পার যে, ‘কিতাব তো শুধু আমাদের পূর্বের দু’সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছিল; আর আমরা তাদের পাঠ সম্বন্ধে গাফিল ছিলাম’। কিংবা তোমরা এ কথাও বলতে না পার যে, ‘যদি আমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হতো, তাহলে আমরা তাদের চেয়ে অধিক হেদায়াতপ্রাপ্ত হতাম। সুতরাং এখন তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়াত ও রহমত এসেছে। অতঃপর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অচিরেই আমি তাদেরকে তাদের এ জঘন্য আচরণের জন্য নিকৃষ্ট শাস্তি দেব। (সূরা আন‘আম, ১৫৫-১৫৭)

يُلْقِى الرُّوْحَ مِنْ اَمْرِهٖ عَلٰى مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ

তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার প্রতি স্বীয় আদেশসহ রূহ (ওহী) প্রেরণ করেন, যেন সে (মানুষদেরকে) সাক্ষাৎ দিবস (কিয়ামত) সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে। (সূরা মু’মিন- ১৫)

ব্যাখ্যা : আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর মুকাবিলায় এ মর্মে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ দিতে চান না যে, আপনি প্রকৃত সত্য সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করেননি এবং আমাদেরকে সঠিক পথ সম্পর্কে জানানোর কোন ব্যবস্থাও করেননি। ফলে অজ্ঞতাবশত আমরা যখন ভুল পথে চলতে শুরু করেছি অমনি আমাদেরকে পাকড়াও করতে শুরু করেছেন। এ যুক্তি প্রদর্শনের পথ রোধ করার জন্য আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন। এভাবে জিন ও মানবজাতিকে সত্যপথ সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে অবগত করেছেন। এরপরও লোকেরা ভুল পথে চললে এবং আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিলে- এর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাদের উপর বর্তায়, আল্লাহর উপর নয়।