hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬১০

অধ্যায়- ৩৮ : সত্যিকার মুসলিমদের ভূমিকা

এ কঠিন বিপদ তাদের ঈমানকে আরো বৃদ্ধি করে দিল :

وَلَمَّا رَاَى الْمُؤْمِنُوْنَ الْاَحْزَابَ قَالُوْا هٰذَا مَا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُوْلُهٗ وَصَدَقَ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ وَمَا زَادَهُمْ اِلَّاۤ اِيْمَانًا وَّتَسْلِيْمًا

যখন মুমিনরা সম্মিলিত শত্রুবাহিনীকে দেখতে পেল তখন তারা বলে উঠল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তো আমাদেরকে এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্য আরো বৃদ্ধি পেল। (সূরা আহযাব- ২২)

ব্যাখ্যা : যখন যুদ্ধের চরম মুহূর্ত উপস্থিত হলো তখন মুনাফিক ও মুমিন উভয় দলেরই আল্লাহর অঙ্গীকারের কথা মনে পড়ে। এতে মুনাফিকদের কুফরী প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল এবং মুমিনদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। মুনাফিকরা বলেছিল, ‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আমাদের সাথে যেসব অঙ্গীকার করেছিলেন, সেগুলো মিথ্যা।’’ কিন্তু প্রকৃত মুসলিমরা বিপদাপদের পাহাড় দেখেও নড়ে যাওয়া এবং আল্লাহর হুকুম পালন করা থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তারা আরো বেশি দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে নিজেদের সবকিছু তাঁর হাতে সোপর্দ করতে উদ্যোগী হয়ে উঠল। কেননা এ অঙ্গীকার এমন নয় যে, ঈমান আনার সাথে সাথেই তোমরা দুনিয়ার শাসন কর্তৃত্ব লাভ করবে এবং ফেরেশতারা এসে তোমাদের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দেবে। বরং এ অঙ্গীকার হলো, কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তোমাদের এগিয়ে যেতে হবে, বিপদের পাহাড় তোমাদের মাথায় ভেঙে পড়বে, তোমাদের চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, তবেই কোন এক পর্যায়ে আল্লাহর অনুগ্রহ তোমাদের প্রতি বর্ষিত হবে এবং তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের এমনসব সাফল্য দান করা হবে, যেগুলো দেয়ার অঙ্গীকার আল্লাহ মুমিন বান্দাদের সাথে করেছিলেন। উক্ত প্রেক্ষাপট থেকে একটি বিষয় শিক্ষণীয় যে, মুমিনের আন্তরিকতা যতবেশি বৃদ্ধি পেতে থাকে, আনুগত্য তত পূর্ণতা লাভ করে। তাদের মাঝে আল্লাহর সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা-চেতনা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মনিমগ্নতা যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, সে অনুপাতে তাদের ঈমানও বেড়ে যেতে থাকে। এভাবে এক সময় মানুষ সিদ্দীক তথা পূর্ণ সত্যবাদীর মর্যাদায় উন্নীত হয়।

তারা সংগ্রাম করার ওয়াদা বাস্তবায়ন করেন :

مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ رِجَالٌ صَدَقُوْا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ

মুমিনদের মধ্যে কতক লোক এমনও আছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। (সূরা আহযাব- ২৩)

ব্যাখ্যা : আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার চাচা আনাস ইবনে নায্র বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তিনি (রাসূল সাঃ কে) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের সঙ্গে আপনি প্রথম যে যুদ্ধটি করলেন তাতে আমি অংশগ্রহণ করতে পারিনি। যদি কোন সময় আল্লাহ আমাকে মুশরিকদের বিপক্ষে যুদ্ধের সুযোগ দান করেন তবে তিনি দেখবেন, আমি কীভাবে যুদ্ধ করি। অতঃপর যেদিন ওহুদের যুদ্ধ আরম্ভ হলো এবং মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল, তখন আনাস ইবনে নায্র বলছিলেন, হে আল্লাহ! এদের (অর্থাৎ রাসূলের সাহাবীদের) কৃতকর্মের জন্য আমি তোমার কাছে অক্ষমতা প্রকাশ করছি; আর ওদের অর্থাৎ মুশরিকদের কার্যকলাপের সাথে আমার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি। অতঃপর তিনি অগ্রসর হলে সা‘দ ইবনে মু‘আয (রাঃ) এর সাথে তাঁর দেখা হলো। তখন তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে সা‘দ ইবনে মু‘আয! নায্রের (আনাসের পিতা) প্রতিপালকের শপথ করে বলছি, এ মুহূর্তে জান্নাতই আমার একমাত্র আশা। আমি ওহুদের দিক থেকে জান্নাতের সুগন্ধি পাচ্ছি। পরবর্তীকালে সা‘দ (রাঃ) রাসূল ﷺ কে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আনাস ইবনে নায্র যেমনটি করেছে, আমি তো তেমনটি করতে সক্ষম হইনি। আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, যুদ্ধের পর আমরা তাঁকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি এবং তাঁর দেহে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আশিটিরও বেশি জখম দেখতে পেয়েছি। মুশরিকরা নাক, কান কেটে ও চোখ উপড়িয়ে তাঁর লাশকে আকার-আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলার কারণে তাঁর বোন ছাড়া কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি। সে আঙ্গুলের আগা দেখে তাঁকে চিনতে সক্ষম হয়েছিল। আনাস (রাঃ) বলেন, আমাদের ধারণা কুরআনের এ বাণীটি তাঁর ও অনুরূপ ব্যক্তিদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হা/২৮০৫)

কেউ শহীদ হন এবং কেউ শাহাদাতের অপেক্ষায় থাকেন :

فَمِنْهُمْ مَّنْ قَضٰى نَحْبَهٗ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَّنْتَظِرُؗ وَمَا بَدَّلُوْا تَبْدِيْلًا

তাদের মধ্যে কেউ কেউ শাহাদাতবরণ করেছে এবং কেউ কেউ অপেক্ষায় রয়েছে। তারা স্বীয় সংকল্প একটুও পরিবর্তন করেনি। (সূরা আহযাব- ২৩)

যে যেমন প্রতিদান পাওয়ার যোগ্য আল্লাহ তাকে তেমনই দিয়ে থাকেন :

لِيَجْزِيَ اللهُ الصَّادِقِيْنَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِيْنَ اِنْ شَآءَ اَوْ يَتُوْبَ عَلَيْهِمْؕ اِنَّ اللهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا

এটা এজন্য যে, যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার জন্য প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আহযাব- ২৪)

পরে এক রাতে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় শত্রুদেরকে আক্রমণ করে :

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اذْكُرُوْا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ اِذْ جَآءَتْكُمْ جُنُوْدٌ فَاَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيْحًا وَّجُنُوْدًا لَّمْ تَرَوْهَاؕ وَكَانَ اللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرًا

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করেছিল, তখন আমি তাদের উপর এক প্রচন্ড বায়ু প্রেরণ করেছিলাম। আর এমন একটি সৈন্য দল (প্রেরণ করেছিলাম) যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনি। (মনে রেখো) তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন। (সূরা আহযাব- ৯)

ব্যাখ্যা : শত্রুসেনারা যখন মদিনাবাসীর উপর চড়াও হয়েছিল ঠিক তখনই এ ধূলিঝড় আসেনি। বরং অবরোধের পর এ ধূলিঝড় আসে। অদৃশ্য সেনাবাহিনী বলতে এমনসব গোপন শক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষের বিভিন্ন বিষয়াবলিতে আল্লাহর ইশারায় কাজ করতে থাকে এবং মানুষ তার খবরই রাখে না। অধিকাংশ সময় এসব গোপন শক্তির কার্যকারিতা চূড়ান্ত প্রমাণিত হয়। এসব শক্তি যেহেতু আল্লাহর ফেরেশতাদের অধীনে কাজ করে, তাই সেনাবাহিনী অর্থে ফেরেশতাদেরকেও ধরা যেতে পারে; যদিও এখানে ফেরেশতাদের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।

শত্রুরা বিফল হয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যায় :

وَرَدَّ اللهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوْا خَيْرًا

আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধ সহকারে ফিরিয়ে দিলেন; ফলে তারা কোন কল্যাণ অর্জন করতে পারেনি। (সূরা আহযাব- ২৫)

আল্লাহই মুমিনদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যান :

وَكَفَى اللهُ الْمُؤْمِنِيْنَ الْقِتَالَؕ وَكَانَ اللهُ قَوِيًّا عَزِيْزًا

আর যুদ্ধক্ষেত্রে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ মহাক্ষমতাবান ও প্রবল প্রতাপশালী। (সূরা আহযাব- ২৫)