hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৫৬

পর্ব- ৪৪ : কিয়ামত অধ্যায়- ১ : কিয়ামত অবশ্যই আসবে

কিয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে কোন সন্দেহ নেই :

اِنَّ السَّاعَةَ لَاٰتِيَةٌ لَّا رَيْبَ فِيْهَاؗ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُوْنَ

কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা বিশ্বাস করে না। (সূরা মু’মিন- ৫৯)

وَاَنَّ السَّاعَةَ اٰتِيَةٌ لَّا رَيْبَ فِيْهَا وَاَنَّ اللهَ يَبْعَثُ مَنْ فِى الْقُبُوْرِ

কিয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে কোন সন্দেহ নেই এবং কবরে যারা আছে অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে উত্থিত করবেন। (সূরা হজ্জ- ৭)

আল্লাহ শপথ করে বলেছেন যে, কিয়ামত আসবেই :

وَالْمُرْسَلَاتِ عُرْفًا – فَالْعَاصِفَاتِ عَصْفًا – وَالنَّاشِرَاتِ نَشْرًا – فَالْفَارِقَاتِ فَرْقًا – فَالْمُلْقِيَاتِ ذِكْرًا – عُذْرًا اَوْ نُذْرًا – اِنَّمَا تُوْعَدُوْنَ لَوَاقِعٌ

শপথ! কল্যাণস্বরূপ প্রেরিত বায়ুর। অতঃপর শপথ! প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের এবং বহনকারী বায়ুর। অতঃপর শপথ! (মেঘপুঞ্জ) বিচ্ছিন্নকারী বায়ুর এবং তার, যে মানুষের অন্তরে তা পৌঁছে দেয় উপদেশ অনুশোচনা বা সতর্কতাস্বরূপ। নিশ্চয় তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে তা অবশ্যই সংঘটিত হবে।

(সূরা মুরসালাত, ১-৭)

কিয়ামতকে প্রতিহত করার শক্তি কারো থাকবে না :

بَلْ تَاْتِيْهِمْ بَغْتَةً فَتَبْهَتُهُمْ فَلَا يَسْتَطِيْعُوْنَ رَدَّهَا وَلَا هُمْ يُنْظَرُوْنَ

বস্তুত সেটা তাদের উপর আসবে অতর্কিতভাবে এবং তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে। ফলে তারা সেটা রোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না। (সূরা আম্বিয়া- ৪০)

اَزِفَتِ الْاٰزِفَةُ – لَيْسَ لَهَا مِنْ دُوْنِ اللهِ كَاشِفَةٌ

কিয়ামত আসন্ন, আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। (সূরা নাজম- ৫৭, ৫৮)

কাফিররা কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে :

وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَا تَاْتِيْنَا السَّاعَةُؕ قُلْ بَلٰى وَرَبِّيْ لَتَاْتِيَنَّكُمْ

কাফিররা বলে, আমাদের উপর কিয়ামত আসবে না। (তাদেরকে) বলো, হ্যাঁ- আমার প্রতিপালকের শপথ! অবশ্যই তোমাদের উপর কিয়ামত আসবে। (সূরা সাবা- ৩)

بَلْ كَذَّبُوْا بِالسَّاعَةِ وَاَعْتَدْنَا لِمَنْ كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيْرًا

কিন্তু তারা কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করেছে। আর যারা কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে তাদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলমত্ম অগ্নি। (সূরা ফুরক্বান- ১১)

তারা কিয়ামতের সময় জানতে চায় :

يَسْاَلُوْنَكَ عَنِ السَّاعَةِ اَيَّانَ مُرْسَاهَا

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, ওটা কখন সংঘটিত হবে? (সূরা নাযি‘আত- ৪২)

আল্লাহর পক্ষ থেকে এর জবাব :

فِيْمَ اَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا – اِلٰى رَبِّكَ مُنْتَهَاهَا – اِنَّمَاۤ اَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَّخْشَاهَا – كَاَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوْاۤ اِلَّا عَشِيَّةً اَوْ ضُحَاهَا

এর আলোচনার সাথে তোমার কী সম্পর্ক? এ সংক্রান্ত জ্ঞান তোমার প্রতিপালক পর্যন্তই শেষ। যারা একে ভয় করে তুমি তো কেবল তাদেরই সতর্ককারী। যেদিন তারা এটাকে দেখবে তখন তাদের মনে হবে, যেন তারা (পৃথিবীতে) এক সন্ধ্যা অথবা এক সকালের অধিক সময় অবস্থান করেনি। (সূরা নাযি‘আত, ৪৩-৪৬)

কিয়ামত ঘটে গেলে একে অস্বীকার করার কেউ থাকবে না :

اِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ – لَيْسَ لِوَقْعَتِهَا كَاذِبَةٌ – خَافِضَةٌ رَّافِعَةٌ

যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, (তখন) একে অস্বীকার করার কেউ থাকবে না। এটা কাউকে করবে নীচু এবং কাউকে করবে সমুন্নত। (সূরা ওয়াক্বিয়া, ১-৩)

কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই জানেন :

وَعِنْدَهٗ عِلْمُ السَّاعَةِۚ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ

কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তাঁরই আছে এবং তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা যুখরুফ- ৮৫)

اِنَّ اللهَ عِنْدَهٗ عِلْمُ السَّاعَةِ

নিশ্চয় আল্লাহর কাছে কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে। (সূরা লুক্বমান- ৩৪)

কিয়ামত কখন হবে- নবীরাও তা জানতেন না :

يَسْاَلُوْنَكَ عَنِ السَّاعَةِ اَيَّانَ مُرْسَاهَاؕ قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْۚ لَا يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَاۤ اِلَّا هُوَؕ ثَقُلَتْ فِى السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ لَا تَاْتِيْكُمْ اِلَّا بَغْتَةًؕ يَسْاَلُوْنَكَ كَاَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَاؕ قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللهِ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ

তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? বলো, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধুমাত্র আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে। তিনিই যথাসময়ে তা প্রকাশ করবেন, তখন সেটা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটাবে। আকস্মিকভাবেই তা তোমাদের উপর আপতিত হবে। তুমি এ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত মনে করে তারা তোমাকে প্রশ্ন করে। বলো, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছেই রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। (সূরা আ‘রাফ- ১৮৭)

কিয়ামত বেশি দূরে নয় :

وَيَقُوْلُوْنَ مَتٰى هُوَؕ قُلْ عَسٰۤى اَنْ يَّكُوْنَ قَرِيْبًا

তারা বলবে, সেটা কবে? বলো, সম্ভবত তা খুবই নিকটে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৫১)

اِنَّهُمْ يَرَوْنَهٗ بَعِيْدًا – وَنَرَاهُ قَرِيْبًا

তারা ঐ দিনকে অনেক দূরে মনে করে, অথচ আমি তা দেখছি খুবই নিকটে। (সূরা মা‘আরিজ- ৬, ৭)

اِقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِيْ غَفْلَةٍ مُّعْرِضُوْنَ

মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় খুবই নিকটে, অথচ তারা উদাসীনতার বশবর্তী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

(সূরা আম্বিয়া- ১)

মাত্র অল্প কয়েকটি দিনের জন্য অবকাশ দেয়া হচ্ছে :

اِنَّ السَّاعَةَ اٰتِيَةٌ اَكَادُ اُخْفِيْهَا لِتُجْزٰى كُلُّ نَفْسٍ ۢ بِمَا تَسْعٰى

কিয়ামত অবশ্যই আসবে। আমি এটা গোপন রাখতে চাই, যাতে প্রত্যেকেই নিজ কর্মানুযায়ী ফল লাভ করতে পারে। (সূরা ত্বা-হা- ১৫)

কিয়ামতের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে :

فَهَلْ يَنْظُرُوْنَ اِلَّا السَّاعَةَ اَنْ تَاْتِيَهُمْ بَغْتَةًۚ فَقَدْ جَآءَ اَشْرَاطُهَاۚ فَاَنّٰى لَهُمْ اِذَا جَآءَتْهُمْ ذِكْرَاهُمْ

তবে এরা কি শুধু কিয়ামতের অপেক্ষায় আছে যে, তা হঠাৎ তাদের উপর এসে পড়ুক? কিয়ামতের লক্ষণগুলো তো এসেই গেছে। (যখন কিয়ামত এসেই যাবে) তখন তাদের নসীহত গ্রহণের কিছু বাকি থাকবে কি? (সূরা মুহাম্মাদ- ১৮)

ভূগর্ভের প্রাণী বেরিয়ে আসবে :

وَاِذَا وَقَعَ الْقَوْلُ عَلَيْهِمْ اَخْرَجْنَا لَهُمْ دَآبَّةً مِّنَ الْاَرْضِ تُكَلِّمُهُمْ اَنَّ النَّاسَ كَانُوْا بِاٰيَاتِنَا لَا يُوْقِنُوْنَ

যখন তাদের নিকট ঘোষিত শাস্তি এসে যাবে, তখন আমি মাটির ভেতর হতে বের করব এক জীব, যা তাদের সঙ্গে কথা বলবে। আর এটা এজন্য যে, মানুষ আমার নিদর্শনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী নয়।

(সূরা নামল- ৮২)

ব্যাখ্যা : আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এর বক্তব্য হচ্ছে, যখন দুনিয়ার বুকে সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার মতো কোন লোক থাকবে না, তখনই এ ঘটনা ঘটবে। নবী ﷺ বলেন, ‘‘সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে এবং একদিন দিন-দুপুরে এ জানোয়ার বের হয়ে আসবে।’’ (সহীহ মুসলিম, হা/৪১৭)

একটি প্রাণী এভাবে মানুষের সাথে মানুষের ভাষায় কথা বলা, এটি আল্লাহর অসীম শক্তির একটি নিদর্শন। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে বাকশক্তি দান করতে পারেন। কিয়ামতের পূর্বে তিনি তো শুধুমাত্র একটি প্রাণীকে বাকশক্তি দান করবেন কিন্তু যখন কিয়ামত কায়েম হয়ে যাবে তখন আল্লাহর আদালতে মানুষের চোখ, কান ও তার গায়ের চামড়া পর্যন্ত কথা বলতে থাকবে।

কিয়ামত হঠাৎ করে আসবে :

اَفَاَمِنُوْاۤ اَنْ تَاْتِيَهُمْ غَاشِيَةٌ مِّنْ عَذَابِ اللهِ اَوْ تَاْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً

তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাসিত্ম হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ? (সূরা ইউসুফ- ১০৭)

وَلَا يَزَالُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فِيْ مِرْيَةٍ مِّنْهُ حَتّٰى تَاْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً اَوْ يَاْتِيَهُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَقِيْمٍ

যারা কুফরী করেছে তারা তাতে সন্দেহ পোষণ করা হতে বিরত হবে না, যতক্ষণ না তাদের নিকট আকস্মিকভাবে কিয়ামত এসে পড়বে অথবা এসে পড়বে এক বন্ধ্যা দিনের শাসিত্ম। (সূরা হজ্জ- ৫৫)

ব্যাখ্যা : এখানে কিয়ামতের দিনকে বন্ধ্যা বলা হয়েছে, যেহেতু ঐ দিনের পর আর কোন বিচারের দিন আসবে না।

মানুষের অজান্তেই কিয়ামত এসে পড়বে :

فَيَاْتِيَهُمْ بَغْتَةً وَّهُمْ لَا يَشْعُرُوْنَ

ফলে তা তাদের নিকট আকস্মিকভাবে এসে পড়বে, কিন্তু তারা কিছুই বুঝতে পারবে না। (সূরা শু‘আরা- ২০২)

هَلْ يَنْظُرُوْنَ اِلَّا السَّاعَةَ اَنْ تَاْتِيَهُمْ بَغْتَةً وَّهُمْ لَا يَشْعُرُوْنَ

তবে কি তারা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে কিয়ামত আগমন করারই অপেক্ষা করছে? অথচ (তা অচিরেই এসে যাবে, কিন্তু) তারা অনুধাবন করতে পারবে না। (সূরা যুখরুফ- ৬৬)

ব্যাখ্যা : অর্থাৎ কিয়ামত হঠাৎ সংঘটিত হবে; কিন্তু লোকেরা তা জানতেও পারবে না। এমনকি লোকেরা নিশ্চিন্তে নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে থাকবে এবং তাদের মনে ক্ষুদ্রতম চিন্তাও জাগবে না যে, দুনিয়ার শেষ সময় এসে গেছে। এ অবস্থায় হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হবে এবং যে যেখানে থাকবে সে সেখানেই বেহুশ হয়ে যাবে।

চোখের পলকেই তা ঘটে যাবে :

وَمَاۤ اَمْرُ السَّاعَةِ اِلَّا كَلَمْحِ الْبَصَرِ اَوْ هُوَ اَقْرَبُؕ اِنَّ اللهَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

কিয়ামতের ব্যাপারটি চক্ষুর পলকের ন্যায়, বরং সেটা তদপেক্ষাও নিকটে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সূরা নাহল- ৭৭)

ব্যাখ্যা : কিয়ামত ধীরে ধীরে সংঘটিত হবে না। তা আসার সময় দূর থেকে কেউ দেখতে পারবে না এবং এর মাঝখানে কেউ নিজেদেরকে সামলে নিয়ে কোন রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করার সুযোগও পাবে না। যে কোন দিন যে কোন মুহূর্তে চোখের পলকে বা তার চেয়েও কম সময়ে তা এসে যাবে। কাজেই যার সংশোধন হওয়ার সে যেন অবিলম্বে সংশোধিত হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত ফায়সালার সময় দূরে মনে করে পাশ কাটিয়ে না যায়। একটি নিঃশ্বাস সম্পর্কেও কেউ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলতে পারবে না যে, তার পরের শ্বাস গ্রহণের সুযোগ অবশ্যই হবে।