hadith book logo

তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৭১

অধ্যায়- ৩ : মুনাফিকদের সাথে মুসলিমদের করণীয়

তাদের অনুসরণ করা যাবে না :

يَاۤ اَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِيْنَ وَالْمُنَافِقِيْنَؕ اِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيْمًا حَكِيْمًا

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও উৎকৃষ্ট। (সূরা আহযাব- ১)

তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না :

وَلَا تَتَّخِذُوْا مِنْهُمْ وَلِيًّا وَّلَا نَصِيْرًا

আর তোমরা কোন অবস্থাতেই তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করো না। (সূরা নিসা- ৯৮)

তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে :

يَاۤ اَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْؕ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُؕ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ

হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো এবং তাদের ব্যাপারে কঠোর হও। (কেননা) তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! (সূরা তাওবা- ৭৩; সূরা তাহরীম- ৯)

তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে :

يَحْسَبُوْنَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْؕ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْؕ قَاتَلَهُمُ اللهُ اَنّٰى يُؤْفَكُوْنَ

তারা (ভয়ে) যে কোন ধরনের বড় আওয়াজকেই তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন; বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চালিত হচ্ছে? (সূরা মুনাফিকূন- ৪)

তাদেরকে মর্মস্পর্শী ভাষায় বুঝাতে হবে :

اُولٰٓئِكَ الَّذِيْنَ يَعْلَمُ اللهُ مَا فِيْ قُلُوْبِهِمْ فَاَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُلْ لَّهُمْ فِۤيْ اَنْفُسِهِمْ قَوْلًا ۢبَلِيْغًا

এরাই তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো এবং তাদেরকে ভালো উপদেশ দাও। আর তাদেরকে এমন কথা বলো, যা তাদের অন্তর স্পর্শ করে। (সূরা নিসা- ৬৩)

তাদের দেয়া কষ্টকে এড়িয়ে যেতে হবে :

وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِيْنَ وَالْمُنَافِقِيْنَ وَدَعْ اَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِؕ وَكَفٰى بِاللهِ وَكِيْلًا

আর আপনি কাফির ও মুনাফিকদের অনুসরণ করবেন না এবং (তাদের পক্ষ হতে আগত) নির্যাতনকে উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা আহযাব- ৪৮)

তাদের মসজিদে নামায পড়া যাবে না :

وَالَّذِيْنَ اتَّخَذُوْا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَّكُفْرًا وَّتَفْرِيْقًا ۢبَيْنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَاِرْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ مِنْ قَبْلُؕ وَلَيَحْلِفُنَّ اِنْ اَرَدْنَاۤ اِلَّا الْحُسْنٰىؕ وَاللهُ يَشْهَدُ اِنَّهُمْ لَكَاذِبُوْنَ ‐ لَا تَقُمْ فِيْهِ اَبَدًاؕ لَمَسْجِدٌ اُسِّسَ عَلَى التَّقْوٰى مِنْ اَوَّلِ يَوْمٍ اَحَقُّ اَنْ تَقُوْمَ فِيْهِؕ فِيْهِ رِجَالٌ يُّحِبُّوْنَ اَنْ يَّتَطَهَّرُوْاؕ وَاللهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِيْنَ

যারা (মুসলিমদের) ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতোপূর্বে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে তার গোপন ঘাঁটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করেছে, অবশ্যই তারা শপথ করে বলবে যে, আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এটা (নির্মাণ) করেছি; (কিন্তু) আল্লাহ সাক্ষী যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো তাতে (সালাতে) দাঁড়াবে না; যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাক্বওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে, সেটাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। তথায় এমন লোক আছে যারা পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে; আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে পছন্দ করেন। (সূরা তাওবা- ১০৭, ১০৮)

শানে নুযূল : মদিনায় খাযরাজ গোত্রে আবু আমের নামে এক ব্যক্তি ছিল। তাকে আহলে কিতাবের আলিমদের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তি বলে গণ্য করা হতো। রাসূল ﷺ যখন মদিনায় পৌঁছলেন তখন সেখানে আবু আমেরের ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিরাজ করছিল। কিন্তু সে সত্যকে গ্রহণ করার পরিবর্তে উল্টো তার বিরোধিতা শুরু করল। অতঃপর তার ও মুনাফিকদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো যে, মদিনায় তারা নিজেদের একটি পৃথক মসজিদ তৈরি করে নেবে। মদিনায় এ সময় দু’টি মসজিদ ছিল। একটি মসজিদে কুবা, অন্যটি মসজিদে নববী। এ দু’টি মসজিদ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় একটি মসজিদ নির্মাণ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাই তারা নিজেদের পৃথক মসজিদ তৈরি করার আগে তার বৈধতা প্রমাণ করতে বাধ্য ছিল। এ উদ্দেশ্যে তারা নবী ﷺ এর সামনে এ নতুন নির্মাণ কাজের প্রয়োজন পেশ করে বলে, ‘‘আমরা শুধুমাত্র নামাযীদের সুবিধার্থে এ নতুন মসজিদটি নির্মাণ করতে চাই।’’ নির্মাণ কাজ শেষ হলে এরা নবী ﷺ এর নিকট উপস্থিত হলো এবং সেখানে একবার নামায পড়িয়ে মসজিদটির উদ্বোধন করার জন্য তাঁর কাছে আবেদন জানাল। কিন্তু নবী ﷺ বললেন, ‘‘শীঘ্রই আমাকে একটি বড় অভিযানে বের হতে হবে, সেখান থেকে ফিরে এসে দেখা যাবে’’। এ কথা বলে তিনি তাদের আবেদন এড়িয়ে গেলেন। এরপর তিনি তাবুক যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং তাঁর রওয়ানা হওয়ার পর এ মুনাফিকরা এ মসজিদে নিজেদের জোট গড়ে তুলতে এবং ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগল। তাবুক থেকে ফেরার পথে নবী ﷺ যখন মদিনার নিকটবর্তী ‘যী আওয়ান’ নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন এ আয়াত নাযিল হলো। ফলে তিনি তখনই কয়েকজন লোককে এ দায়িত্ব দিয়ে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন যে, তাঁর মদিনায় পৌঁছার আগেই যেন তারা ‘যিরার’ মসজিদটি ধূলিস্যাৎ করে দেয়।

তাদের জানাযা পড়া যাবে না :

وَلَا تُصَلِّ عَلٰۤى اَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ اَبَدًا وَّلَا تَقُمْ عَلٰى قَبْرِهٖؕ اِنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهٖ وَمَاتُوْا وَهُمْ فَاسِقُوْنَ

তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে তুমি কখনো তার জন্য (জানাযার) সালাত পড়বে না এবং তার কবরের পার্শ্বেও দাঁড়াবে না। তারা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং তারা পাপাচারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। (সূরা তাওবা- ৮৪)

শানে নুযূল : মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেলে তার ছেলে আবদুল্লাহ (রাঃ) নবী ﷺ এর খেদমতে হাযির হয়ে কাফন হিসেবে ব্যবহারের জন্য তাঁর কোর্তা চাইলেন। নবী ﷺ অত্যন্ত উদার হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে কোর্তাটি দিয়ে দিলেন। তারপর আবদুল্লাহ (রাঃ) নবী ﷺ কেই জানাযার নামায পড়ানোর জন্য অনুরোধ করলেন। ফলে তিনি এজন্যও তৈরি হয়ে গেলেন। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে তাঁকে জানাযা পড়ানো থেকে বিরত রাখা হলো। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি হচ্ছে, কোন নেতার জন্য এমন কোন কাজ করা বৈধ হবে না, যাতে শত্রুপক্ষের সাহস বেড়ে যায়।

ব্যাখ্যা : এ থেকে শরীয়াতের এ বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে যে, অশ্লীল এবং ফাসিক কাজকর্মে লিপ্ত ব্যক্তির জানাযার নামায মুসলিমদের ইমাম ও নেতৃস্থানীয় লোকদের পড়ানো উচিত নয়। তাতে শরীক হওয়াও উচিত নয়। এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর নবী ﷺ নিয়ম করে নিয়েছিলেন যে, কোন জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য তাকে ডাকা হলে তিনি প্রথমে মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। জিজ্ঞেস করতেন, সে কেমন লোক ছিল। যদি জানতে পারতেন যে, সে অসচ্চরিত্রের অধিকারী ছিল, তাহলে তার পরিবারের লোকদের বলে দিতেন, তোমরা যেভাবে চাও একে দাফন করে দিতে পার।