১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৩২
অধ্যায়- ১৫ : মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের মধ্যে কথোপকথন
ফিরাউন বলল, তুমি যাদুগ্রস্ত :
فَقَالَ لَهٗ فِرْعَوْنُ اِنِّيْ لَاَظُنُّكَ يَا مُوْسٰى مَسْحُوْرًا
ফিরাউন তাকে বলেছিল, হে মূসা! আমি মনে করি তুমি তো যাদুগ্রস্ত। (সূরা বনী ইসরাঈল– ১০১)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَاۤ اَنْزَلَ هٰۤؤُلَآءِ اِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ بَصَآئِرَۚ وَاِنِّيْ لَاَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُوْرًا
মূসা বলল, তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন। হে ফিরাউন! আমি তো দেখছি তোমার ধ্বংস আসন্ন! (সূরা বনী ইসরাঈল– ১০২)
ফিরাউনের প্রশ্ন :
قَالَ فَمَنْ رَّبُّكُمَا يَا مُوْسٰى
ফিরাউন বলল, হে মূসা! তোমাদের প্রতিপালক কে? (সূরা ত্বা–হা– ৪৯)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ رَبُّنَا الَّذِيْۤ اَعْطٰى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهٗ ثُمَّ هَدٰى
মূসা বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন। (সূরা ত্বা–হা– ৫০)
ফিরাউনের দ্বিতীয় প্রশ্ন :
قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُوْنِ الْاُوْلٰى
ফিরাউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বা–হা– ৫১)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে যারা বংশানুক্রমে বিভিন্ন প্রভুর উপাসনা করেছে তারা সবাই কি পথভ্রষ্ট ছিল? তারা সবাই কি শাস্তিযোগ্য ছিল? তারা সবাই কি বুদ্ধিভ্রষ্ট ছিল? আমাদের সকল বুজুর্গ কি পথভ্রষ্ট ছিল? তারা কি কিছুই বুঝেননি? সত্যপন্থীদের সত্য প্রচারের বিরুদ্ধে এ জাতীয় অস্ত্রসমূহ সর্বদা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর মুর্খদের ক্ষেত্রে এটা বড়ই প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে। যে সময় কুরআনের আয়াতগুলো নাযিল হয় সে সময় মক্কায় নবী ﷺ এর দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সবচেয়ে বেশি এ অস্ত্রটিকেই কাজে লাগানো হয়েছিল।
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ فِيْ كِتَابٍۚ لَا يَضِلُّ رَبِّيْ وَلَا يَنْسٰى
মূসা বলল, এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকট কিতাবে রয়েছে। আর আমার প্রতিপালক ভুল করেন না এবং ভুলেও যান না। (সূরা ত্বা–হা– ৫২)
ব্যাখ্যা : তারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে পৌঁছে গেছে। তাদের কাজের পেছনে নিহিত অন্তরের ইচ্ছাসমূহ জানার কোন উপায় নেই। কাজেই আল্লাহ তাদেরকে কীভাবে শাস্তি দেবেন? তাদের সমস্ত রেকর্ড আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে। আল্লাহই জানেন তাদের সাথে কী ব্যবহার করতে হবে। তাদের ভূমিকা কী ছিল এবং তাদের পরিণাম কী হবে। সুতরাং আমাদেরও চিন্তা করা উচিত যে, আমাদের ভূমিকা কী এবং আমরা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হব।
ফিরাউন নবীকে শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে খোঁটা দিল :
قَالَ اَلَمْ نُرَبِّكَ فِيْنَا وَلِيْدًا وَّلَبِثْتَ فِيْنَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِيْنَ
ফিরাউন বলল, আমরা কি তোমাকে শৈশবে আমাদের মধ্যে লালনুপালন করিনি? আর তুমি তো তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটিয়েছ। (সূরা শু‘আরা– ১৮)
মূসা (আঃ) বললেন, তা ছিল তোমাদের যুলুমের কারণে :
وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمُنُّهَا عَلَيَّ اَنْ عَبَّدْتَّ بَنِيْۤ اِسْرَآئِيْلَ
আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছ, তা তো এই যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করেছিলে। (সূরা শু‘আরা– ২২)
ফিরাউন বলল, তুমি আমাদের এক লোককে হত্যা করেছ :
وَفَعَلْتَ فَعْلَتَكَ الَّتِيْ فَعَلْتَ وَاَنْتَ مِنَ الْكَافِرِيْنَ
তুমি তো তোমার কর্ম যা করার তা করে ফেলেছ, সুতরাং তুমি অকৃতজ্ঞ। (সূরা শু‘আরা– ১৯)
মূসা (আঃ) বললেন, এ কাজটি ভুলক্রমে সংঘটিত হয়েছে :
قَالَ فَعَلْتُهَاۤ اِذًا وَّاَنَاْ مِنَ الضَّآلِّيْنَ ‐ فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِيْ رَبِّيْ حُكْمًا وَّجَعَلَنِيْ مِنَ الْمُرْسَلِيْنَ
মূসা বলল, আমি তো এটা তখন করেছিলাম, যখন আমি অসতর্ক অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমি যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন আমি তোমাদের নিকট হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। অতঃপর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করেছেন এবং আমাকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন। (সূরা শু‘আরা– ২০, ২১)
ফিরাউন বলল, রাববুল আলামীন কে?
قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِيْنَ
ফিরাউন বলল, জগতসমূহের প্রতিপালক আবার কী? (সূরা শু‘আরা– ২৩)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَاۤ اِنْ كُنْتُمْ مُّوْقِنِيْنَ
মূসা বলল, তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী যা কিছু আছে সবকিছুর প্রতিপালক; যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। (সূরা শু‘আরা– ২৪)
ফিরাউন কথাটি হালকা করল :
قَالَ لِمَنْ حَوْلَهٗۤ اَلَا تَسْتَمِعُوْنَ
ফিরাউন তার পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা শুনছ তো! (সূরা শু‘আরা– ২৫)
মূসা (আঃ) আরো বললেন :
قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ اٰبَآئِكُمُ الْاَوَّلِيْنَ
মূসা বলল, তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক। (সূরা শু‘আরা– ২৬)
ফিরাউন বলল, এ ব্যক্তি একেবারে পাগল :
قَالَ اِنَّ رَسُوْلَكُمُ الَّذِيْۤ اُرْسِلَ اِلَيْكُمْ لَمَجْنُوْنٌ
ফিরাউন বলল, নিশ্চয় তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসূল একজন পাগল। (সূরা শু‘আরা- ৭)
মূসা (আঃ) বললেন, বুদ্ধি থাকলে আমার কথা বুঝবে :
قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَاؕ اِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُوْنَ
মূসা বলল, তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বুঝতে। (সূরা শু‘আরা– ২৮)
ফিরাউন বলল, তুমি যা বলছ তা ইতোপূর্বে শুনিনি :
فَلَمَّا جَآءَهُمْ مُّوْسٰى بِاٰيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوْا مَا هٰذَاۤ اِلَّا سِحْرٌ مُّفْتَرًى وَّمَا سَمِعْنَا بِهٰذَا فِۤيْ اٰبَآئِنَا الْاَوَّلِيْنَ
যখন মূসা তাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে আসল তখন তারা বলল, এটা তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র। আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে কখনো এরূপ কথা শুনিনি। (সূরা ক্বাসাস– ৩৬)
মূসা (আঃ) বললেন, আল্লাহই জানেন- কে হেদায়াত নিয়ে এসেছে :
وَقَالَ مُوْسٰى رَبِّۤيْ اَعْلَمُ بِمَنْ جَآءَ بِالْهُدٰى مِنْ عِنْدِهٖ وَمَنْ تَكُوْنُ لَهٗ عَاقِبَةُ الدَّارِؕ اِنَّهٗ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُوْنَ
মূসা বলল, কে তাঁর নিকট হতে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখিরাতে কার পরিণাম শুভ হবে তা আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত। তবে যালিমরা কখনো সফলকাম হতে পারবে না। (সূরা ক্বাসাস– ৩৭)
ফিরাউন নবীকে হুমকি দিল :
قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ اِلٰهًا غَيْرِيْ لَاَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُوْنِيْنَ
ফিরাউন বলল, তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে ইলাহ্ হিসেবে গ্রহণ কর, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে কারারুদ্ধ করব। (সূরা শু‘আরা– ২৯)
মূসা (আঃ) বললেন, নিদর্শন দেখালেও কি এমন হবে?
قَالَ اَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُّبِيْنٍ
মূসা বলল, আমি যদি তোমার নিকট কোন স্পষ্ট নিদর্শন আনয়ন করি তবুও? (সূরা শু‘আরা– ৩০)
ফিরাউন বলল, নিদর্শন দেখাও :
قَالَ اِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِاٰيَةٍ فَأْتِ بِهَاۤ اِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِيْنَ
ফিরাউন বলল, যদি তুমি কোন নিদর্শন এনে থাক, তবে তুমি সত্যবাদী হলে তা পেশ করো। (সূরা আ‘রাফু ১০৬)
মূসা (আঃ) লাঠি ও হাতের মু‘জিযা দেখালেন :
فَاَلْقٰى عَصَاهُ فَاِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُّبِيْنٌ ‐ وَنَزَعَ يَدَهٗ فَاِذَا هِيَ بَيْضَآءُ لِلنَّاظِرِيْنَ
অতঃপর মূসা তার লাঠি নিক্ষেপ করলে তৎক্ষণাৎ সেটা স্পষ্ট অজগরে পরিণত হলো। আর যখনই মূসা তার হাত বের করল তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেল। (সূরা শু‘আরা– ৩২, ৩৩)
ফিরাউন বলল, এসব যাদু ছাড়া আর কিছু নয় :
فَلَمَّا جَآءَتْهُمْ اٰيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوْا هٰذَا سِحْرٌ مُّبِيْنٌ
অতঃপর যখন তাদের নিকট আমার স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এসে গেল তখন তারা বলল, এটা তো সুস্পষ্ট যাদু। (সূরা নামল- ১৩)
মূসা (আঃ) বললেন, সত্যকে যাদু বলছ কেন?
قَالَ مُوْسٰۤى اَتَقُوْلُوْنَ لِلْحَقِّ لَمَّا جَآءَكُمْ اَسِحْرٌ هٰذَاؕ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُوْنَ
মূসা বলল, যখন সত্য তোমাদের নিকট আসল তখন তার সম্পর্কে তোমরা এরূপ উক্তি করছ কেন? এটা কি যাদু? আর যাদুকররা তো সফলকাম হয় না। (সূরা ইউনুস– ৭৭)
ফিরাউন বলল, তোমরা কি পৃথিবীতে বড় হতে চাও?
قَالُوْاۤ اَجِئْتَنَا لِتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ اٰبَآءَنَا وَتَكُوْنَ لَكُمَا الْكِبْرِيَآءُ فِى الْاَرْضِؕ وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِيْنَ
তারা বলল, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তুমি কি তা হতে আমাদেরকে বিচ্যুত করার জন্য আমাদের নিকট এসেছ, নাকি যাতে করে জমিনে তোমাদের দু’জনের প্রতিপত্তি হয় সেজন্য? আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী নই। (সূরা ইউনুস– ৭৮)
মূসা (আঃ) বললেন, আমি সত্য ছাড়া কিছুই বলি না :
وَقَالَ مُوْسٰى يَا فِرْعَوْنُ اِنِّيْ رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِيْنَ ‐ حَقِيْقٌ عَلٰۤى اَنْ لَّاۤ اَقُوْلَ عَلَى اللهِ اِلَّا الْحَقَّؕ قَدْ جِئْتُكُمْ بِبَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ فَاَرْسِلْ مَعِيَ بَنِيْۤ اِسْرَآئِيْلَ
মূসা বলল, হে ফিরাউন! আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত। এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত কিছুই বলি না। আমি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে স্পষ্ট প্রমাণ তোমাদের নিকট নিয়ে এসেছি। সুতরাং বনী ইসরাঈলকে তুমি আমার সাথে যেতে দাও।
(সূরা আ‘রাফু ১০৪, ১০৫)
فَقَالَ لَهٗ فِرْعَوْنُ اِنِّيْ لَاَظُنُّكَ يَا مُوْسٰى مَسْحُوْرًا
ফিরাউন তাকে বলেছিল, হে মূসা! আমি মনে করি তুমি তো যাদুগ্রস্ত। (সূরা বনী ইসরাঈল– ১০১)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَاۤ اَنْزَلَ هٰۤؤُلَآءِ اِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ بَصَآئِرَۚ وَاِنِّيْ لَاَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُوْرًا
মূসা বলল, তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন। হে ফিরাউন! আমি তো দেখছি তোমার ধ্বংস আসন্ন! (সূরা বনী ইসরাঈল– ১০২)
ফিরাউনের প্রশ্ন :
قَالَ فَمَنْ رَّبُّكُمَا يَا مُوْسٰى
ফিরাউন বলল, হে মূসা! তোমাদের প্রতিপালক কে? (সূরা ত্বা–হা– ৪৯)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ رَبُّنَا الَّذِيْۤ اَعْطٰى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهٗ ثُمَّ هَدٰى
মূসা বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন। (সূরা ত্বা–হা– ৫০)
ফিরাউনের দ্বিতীয় প্রশ্ন :
قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُوْنِ الْاُوْلٰى
ফিরাউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বা–হা– ৫১)
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে যারা বংশানুক্রমে বিভিন্ন প্রভুর উপাসনা করেছে তারা সবাই কি পথভ্রষ্ট ছিল? তারা সবাই কি শাস্তিযোগ্য ছিল? তারা সবাই কি বুদ্ধিভ্রষ্ট ছিল? আমাদের সকল বুজুর্গ কি পথভ্রষ্ট ছিল? তারা কি কিছুই বুঝেননি? সত্যপন্থীদের সত্য প্রচারের বিরুদ্ধে এ জাতীয় অস্ত্রসমূহ সর্বদা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর মুর্খদের ক্ষেত্রে এটা বড়ই প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে। যে সময় কুরআনের আয়াতগুলো নাযিল হয় সে সময় মক্কায় নবী ﷺ এর দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সবচেয়ে বেশি এ অস্ত্রটিকেই কাজে লাগানো হয়েছিল।
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّيْ فِيْ كِتَابٍۚ لَا يَضِلُّ رَبِّيْ وَلَا يَنْسٰى
মূসা বলল, এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের নিকট কিতাবে রয়েছে। আর আমার প্রতিপালক ভুল করেন না এবং ভুলেও যান না। (সূরা ত্বা–হা– ৫২)
ব্যাখ্যা : তারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে পৌঁছে গেছে। তাদের কাজের পেছনে নিহিত অন্তরের ইচ্ছাসমূহ জানার কোন উপায় নেই। কাজেই আল্লাহ তাদেরকে কীভাবে শাস্তি দেবেন? তাদের সমস্ত রেকর্ড আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে। আল্লাহই জানেন তাদের সাথে কী ব্যবহার করতে হবে। তাদের ভূমিকা কী ছিল এবং তাদের পরিণাম কী হবে। সুতরাং আমাদেরও চিন্তা করা উচিত যে, আমাদের ভূমিকা কী এবং আমরা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হব।
ফিরাউন নবীকে শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে খোঁটা দিল :
قَالَ اَلَمْ نُرَبِّكَ فِيْنَا وَلِيْدًا وَّلَبِثْتَ فِيْنَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِيْنَ
ফিরাউন বলল, আমরা কি তোমাকে শৈশবে আমাদের মধ্যে লালনুপালন করিনি? আর তুমি তো তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটিয়েছ। (সূরা শু‘আরা– ১৮)
মূসা (আঃ) বললেন, তা ছিল তোমাদের যুলুমের কারণে :
وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمُنُّهَا عَلَيَّ اَنْ عَبَّدْتَّ بَنِيْۤ اِسْرَآئِيْلَ
আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছ, তা তো এই যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করেছিলে। (সূরা শু‘আরা– ২২)
ফিরাউন বলল, তুমি আমাদের এক লোককে হত্যা করেছ :
وَفَعَلْتَ فَعْلَتَكَ الَّتِيْ فَعَلْتَ وَاَنْتَ مِنَ الْكَافِرِيْنَ
তুমি তো তোমার কর্ম যা করার তা করে ফেলেছ, সুতরাং তুমি অকৃতজ্ঞ। (সূরা শু‘আরা– ১৯)
মূসা (আঃ) বললেন, এ কাজটি ভুলক্রমে সংঘটিত হয়েছে :
قَالَ فَعَلْتُهَاۤ اِذًا وَّاَنَاْ مِنَ الضَّآلِّيْنَ ‐ فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِيْ رَبِّيْ حُكْمًا وَّجَعَلَنِيْ مِنَ الْمُرْسَلِيْنَ
মূসা বলল, আমি তো এটা তখন করেছিলাম, যখন আমি অসতর্ক অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমি যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন আমি তোমাদের নিকট হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। অতঃপর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করেছেন এবং আমাকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন। (সূরা শু‘আরা– ২০, ২১)
ফিরাউন বলল, রাববুল আলামীন কে?
قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِيْنَ
ফিরাউন বলল, জগতসমূহের প্রতিপালক আবার কী? (সূরা শু‘আরা– ২৩)
মূসা (আঃ) এর উত্তর :
قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَاۤ اِنْ كُنْتُمْ مُّوْقِنِيْنَ
মূসা বলল, তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী যা কিছু আছে সবকিছুর প্রতিপালক; যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। (সূরা শু‘আরা– ২৪)
ফিরাউন কথাটি হালকা করল :
قَالَ لِمَنْ حَوْلَهٗۤ اَلَا تَسْتَمِعُوْنَ
ফিরাউন তার পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা শুনছ তো! (সূরা শু‘আরা– ২৫)
মূসা (আঃ) আরো বললেন :
قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ اٰبَآئِكُمُ الْاَوَّلِيْنَ
মূসা বলল, তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক। (সূরা শু‘আরা– ২৬)
ফিরাউন বলল, এ ব্যক্তি একেবারে পাগল :
قَالَ اِنَّ رَسُوْلَكُمُ الَّذِيْۤ اُرْسِلَ اِلَيْكُمْ لَمَجْنُوْنٌ
ফিরাউন বলল, নিশ্চয় তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসূল একজন পাগল। (সূরা শু‘আরা- ৭)
মূসা (আঃ) বললেন, বুদ্ধি থাকলে আমার কথা বুঝবে :
قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَاؕ اِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُوْنَ
মূসা বলল, তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বুঝতে। (সূরা শু‘আরা– ২৮)
ফিরাউন বলল, তুমি যা বলছ তা ইতোপূর্বে শুনিনি :
فَلَمَّا جَآءَهُمْ مُّوْسٰى بِاٰيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوْا مَا هٰذَاۤ اِلَّا سِحْرٌ مُّفْتَرًى وَّمَا سَمِعْنَا بِهٰذَا فِۤيْ اٰبَآئِنَا الْاَوَّلِيْنَ
যখন মূসা তাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে আসল তখন তারা বলল, এটা তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র। আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে কখনো এরূপ কথা শুনিনি। (সূরা ক্বাসাস– ৩৬)
মূসা (আঃ) বললেন, আল্লাহই জানেন- কে হেদায়াত নিয়ে এসেছে :
وَقَالَ مُوْسٰى رَبِّۤيْ اَعْلَمُ بِمَنْ جَآءَ بِالْهُدٰى مِنْ عِنْدِهٖ وَمَنْ تَكُوْنُ لَهٗ عَاقِبَةُ الدَّارِؕ اِنَّهٗ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُوْنَ
মূসা বলল, কে তাঁর নিকট হতে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখিরাতে কার পরিণাম শুভ হবে তা আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত। তবে যালিমরা কখনো সফলকাম হতে পারবে না। (সূরা ক্বাসাস– ৩৭)
ফিরাউন নবীকে হুমকি দিল :
قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ اِلٰهًا غَيْرِيْ لَاَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُوْنِيْنَ
ফিরাউন বলল, তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে ইলাহ্ হিসেবে গ্রহণ কর, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে কারারুদ্ধ করব। (সূরা শু‘আরা– ২৯)
মূসা (আঃ) বললেন, নিদর্শন দেখালেও কি এমন হবে?
قَالَ اَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُّبِيْنٍ
মূসা বলল, আমি যদি তোমার নিকট কোন স্পষ্ট নিদর্শন আনয়ন করি তবুও? (সূরা শু‘আরা– ৩০)
ফিরাউন বলল, নিদর্শন দেখাও :
قَالَ اِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِاٰيَةٍ فَأْتِ بِهَاۤ اِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِيْنَ
ফিরাউন বলল, যদি তুমি কোন নিদর্শন এনে থাক, তবে তুমি সত্যবাদী হলে তা পেশ করো। (সূরা আ‘রাফু ১০৬)
মূসা (আঃ) লাঠি ও হাতের মু‘জিযা দেখালেন :
فَاَلْقٰى عَصَاهُ فَاِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُّبِيْنٌ ‐ وَنَزَعَ يَدَهٗ فَاِذَا هِيَ بَيْضَآءُ لِلنَّاظِرِيْنَ
অতঃপর মূসা তার লাঠি নিক্ষেপ করলে তৎক্ষণাৎ সেটা স্পষ্ট অজগরে পরিণত হলো। আর যখনই মূসা তার হাত বের করল তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেল। (সূরা শু‘আরা– ৩২, ৩৩)
ফিরাউন বলল, এসব যাদু ছাড়া আর কিছু নয় :
فَلَمَّا جَآءَتْهُمْ اٰيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوْا هٰذَا سِحْرٌ مُّبِيْنٌ
অতঃপর যখন তাদের নিকট আমার স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এসে গেল তখন তারা বলল, এটা তো সুস্পষ্ট যাদু। (সূরা নামল- ১৩)
মূসা (আঃ) বললেন, সত্যকে যাদু বলছ কেন?
قَالَ مُوْسٰۤى اَتَقُوْلُوْنَ لِلْحَقِّ لَمَّا جَآءَكُمْ اَسِحْرٌ هٰذَاؕ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُوْنَ
মূসা বলল, যখন সত্য তোমাদের নিকট আসল তখন তার সম্পর্কে তোমরা এরূপ উক্তি করছ কেন? এটা কি যাদু? আর যাদুকররা তো সফলকাম হয় না। (সূরা ইউনুস– ৭৭)
ফিরাউন বলল, তোমরা কি পৃথিবীতে বড় হতে চাও?
قَالُوْاۤ اَجِئْتَنَا لِتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ اٰبَآءَنَا وَتَكُوْنَ لَكُمَا الْكِبْرِيَآءُ فِى الْاَرْضِؕ وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِيْنَ
তারা বলল, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তুমি কি তা হতে আমাদেরকে বিচ্যুত করার জন্য আমাদের নিকট এসেছ, নাকি যাতে করে জমিনে তোমাদের দু’জনের প্রতিপত্তি হয় সেজন্য? আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী নই। (সূরা ইউনুস– ৭৮)
মূসা (আঃ) বললেন, আমি সত্য ছাড়া কিছুই বলি না :
وَقَالَ مُوْسٰى يَا فِرْعَوْنُ اِنِّيْ رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِيْنَ ‐ حَقِيْقٌ عَلٰۤى اَنْ لَّاۤ اَقُوْلَ عَلَى اللهِ اِلَّا الْحَقَّؕ قَدْ جِئْتُكُمْ بِبَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ فَاَرْسِلْ مَعِيَ بَنِيْۤ اِسْرَآئِيْلَ
মূসা বলল, হে ফিরাউন! আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত। এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত কিছুই বলি না। আমি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে স্পষ্ট প্রমাণ তোমাদের নিকট নিয়ে এসেছি। সুতরাং বনী ইসরাঈলকে তুমি আমার সাথে যেতে দাও।
(সূরা আ‘রাফু ১০৪, ১০৫)