১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩২৫
অধ্যায়- ৩ : মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল :
وَخُلِقَ الْاِنْسَانُ ضَعِيْفًا
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে। (সূরা নিসা- ২৮)
اَللهُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِّنْ ضُعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ ۢبَعْدِ ضُعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ ۢبَعْدِ قُوَّةٍ ضُعْفًا وَّشَيْبَةً يَّخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ وَهُوَ الْعَلِيْمُ الْقَدِيْرٌ
তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন দুর্বল অবস্থায়। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দুর্বলতার পর শক্তি দান করেছেন, তারপর শক্তির পর পুনরায় দুর্বলতা ও বার্ধক্য দান করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন; তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। (সূরা রূম- ৫৪)
وَمَنْ نُّعَمِّرْهُ نُنَكِّسْهُ فِى الْخَلْقِؕ اَفَلَا يَعْقِلُوْنَ
আমি যাকে দীর্ঘায়ু দান করি, তার স্বাভাবিক অবস্থা উল্টে দেই। তবুও কি তারা বুঝে না? (সূরা ইয়াসীন- ৬৮)
ব্যাখ্যা : আকৃতি বদলে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ বৃদ্ধ বয়সে মানুষের অবস্থা শিশুদের মতো করে দেন। ঠিক শিশুদের মতোই তারা চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়ে। অন্যরা তাদেরকে ওঠাবসা ও খাওয়া-দাওয়াতে সহায়তা করে। এমনকি তারা নিজেদের কাপড়-চোপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা করে দেয়। মোটকথা যে ধরনের দুর্বলতার মধ্য দিয়ে তারা দুনিয়ার জীবন শুরু করেছিল, পুনরায় সে জীবনে পৌঁছে যায়।
وَلَوْ نَشَآءُ لَطَمَسْنَا عَلٰۤى اَعْيُنِهِمْ فَاسْتَبَقُوا الصِّرَاطَ فَأَنّٰى يُبْصِرُوْنَ
আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে দৃষ্টিহীন করে দিতে পারতাম, অতঃপর তারা পথ চলতে চাইলে কেমন করে দেখতে পেত? (সূরা ইয়াসীন- ৬৬)
ব্যাখ্যা : এখানে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বলছেন যে, একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখো, এ দুনিয়ায় যে জীবনের জন্য তোমরা অহংকার করছ, তা কীভাবে আল্লাহর বিপুল শক্তির কাছে একেবারে অসহায় হয়ে আছে? যে চোখের দৃষ্টিশক্তির কারণে তোমরা দুনিয়ার সমস্ত কাজ করে যাচ্ছ, আল্লাহর একটিমাত্র ইশারায় তা অন্ধ হয়ে যেতে পারে। যে পায়ের উপর ভর করে ছুটাছুটি করছ, আল্লাহর একটিমাত্র হুকুমে হঠাৎ তা অবশ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেয়া এ শক্তিগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত কাজ করতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আত্মহারা হয়ে থাক। কিন্তু যখন এদের মধ্য থেকে একটি শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তোমাদের শক্তির বাহাদুরি খাটে না।
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ :
خُلِقَ الْاِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍؕ سَاُرِيْكُمْ اٰيَاتِيْ فَلَا تَسْتَعْجِلُوْنِ
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব। সুতরাং তোমরা আমাকে তাড়াতাড়ি করতে বলো না। (সূরা আম্বিয়া- ৩৭)
وَكَانَ الْاِنْسَانُ عَجُوْلًا
মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রবণ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১১)
মানুষ ঝগড়াটে :
وَكَانَ الْاِنْسَانُ اَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (সূরা কাহফ- ৫৪)
اَوَلَمْ يَرَ الْاِنْسَانُ اَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُّطْفَةٍ فَاِذَا هُوَ خَصِيْمٌ مُّبِيْنٌ
মানুষ কি লক্ষ্য করে না যে, আমি তাকে শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি? এরপরও সে প্রকাশ্য তর্ককারীরূপে পরিণত হলো? (সূরা ইয়াসীন- ৭৭)
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُّعْجِبُكَ قَوْلُهٗ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللهَ عَلٰى مَا فِيْ قَلْبِهٖ وَهُوَ اَلَدُّ الْخِصَامِ
মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যার পার্থিব জীবন সংক্রান্ত কথা তোমাকে অবাক করে দেবে। আর সে তার অন্তরের বিষয়ের উপর আল্লাহকে সাক্ষী বানাবে; মূলত সে ভীষণ ঝগড়াটে। (সূরা বাক্বারা- ২০৪)
মানুষ সাধারণত কৃপণ :
قُلْ لَّوْ اَنْتُمْ تَمْلِكُوْنَ خَزَآئِنَ رَحْمَةِ رَبِّۤيْ اِذًا لَّاَمْسَكْتُمْ خَشْيَةَ الْاِنْفَاقِؕ وَكَانَ الْاِنْسَانُ قَتُوْرًا
বলো, যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভান্ডারের অধিকারীও হতে তবুও তোমরা ‘ব্যয় হয়ে যাবে’ এ আশঙ্কায় তা ধরে রাখতে; আর মানুষ অতিশয় কৃপণ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১০০)
اِنَّ الْاِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا – اِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوْعًا – وَاِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوْعًا
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির চিত্তরূপে। যখন তাকে কোন বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশকারী হয়ে উঠে। আর যখন তাকে কোন কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে অতি কৃপণে পরিণত হয়। (সূরা মা‘আরিজ, ১৯-২১)
মানুষ অকৃতজ্ঞ :
اِنَّ الْاِنْسَانَ لَكَفُوْرٌ مُّبِيْنٌ
নিশ্চয় মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ। (সূরা যুখরুফ- ১৫)
اِنَّ الْاِنْسَانَ لِرَبِّهٖ لَكَنُوْدٌ
নিশ্চয় মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ। (সূরা আদিয়্যাহ- ৬)
وَاِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِى الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ اِلَّاۤ اِيَّاهُۚ فَلَمَّا نَجَّاكُمْ اِلَى الْبَرِّ اَعْرَضْتُمْؕ وَكَانَ الْاِنْسَانُ كَفُوْرًا
যখন সমুদ্রে তোমাদেরকে কোন বিপদ স্পর্শ করে, তখন তোমরা কেবল তিনি ব্যতীত অপর যাদেরকে আহবান করে থাক তারা ব্যর্থ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৬৭)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামতসমূহের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ বিভিন্ন রকম হয়। যেমন- এ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা যে মহান আল্লাহ, অনেকে তা আদৌ স্বীকার করে না। আবার কিছু সংখ্যক লোক এ কথা স্বীকার করে যে, এসব জিনিসের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। তবে তারা এর সাথে অন্যদেরকেও অংশীদার মনে করে, তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অন্যদের কাছে এবং তাঁর দেয়া রিযিক খেয়ে অন্যের গুণ গায়। এটা অস্বীকৃতির আরেকটি রূপ। আরো কিছু লোক আছে যারা আল্লাহকেই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা স্বীকার করে নেয়, কিন্তু নিজেদের সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধের আনুগত্য করে না। এটা অকৃতজ্ঞতা ও নিয়ামত অস্বীকার করার আরেকটি রূপ। কারণ যে ব্যক্তি এরূপ আচরণ করে সে নিয়ামতসমূহ স্বীকার করা সত্ত্বেও নিয়ামতদাতার অধিকারকে অস্বীকার করে। আরো এক শ্রেণির মানুষ মুখে নিয়ামতকে অস্বীকার করে না কিংবা নিয়ামত দানকারীর অধিকারকেও অস্বীকার করে না; কিন্তু কার্যত তাদের এবং একজন অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীর জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য থাকে না। এটা মৌখিক অস্বীকৃতি নয়, কার্যত অস্বীকৃতি।
মানুষ সাধারণত হিংসুক হয়ে থাকে :
اَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلٰى مَاۤ اٰتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهٖ
অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সেজন্য কি তারা তাদেরকে ঈর্ষা করে? (সূরা নিসা- ৫৪)
মানুষ বেশি দিন বাঁচতে চায়, মরতে চায় না :
وَلَتَجِدَنَّهُمْ اَحْرَصَ النَّاسِ عَلٰى حَيَاةٍۚ وَمِنَ الَّذِيْنَ اَشْرَكُوْا يَوَدُّ اَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ اَلْفَ سَنَةٍ وَّمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهٖ مِنَ الْعَذَابِ اَنْ يُّعَمَّرَ وَاللهُ بَصِيْرٌ ۢبِمَا يَعْمَلُوْنَ
নিশ্চয় তুমি তাদেরকে অন্যান্য লোক এবং অংশীবাদীদের চেয়েও অধিকতর আয়ু আকাঙ্ক্ষী হিসেবে পাবে। তাদের প্রত্যেকে কামনা করে যে, সে যেন হাজার বছর আয়ুপ্রাপ্ত হয়; অথচ এ দীর্ঘায়ুও তাকে (আমার) শাস্তি হতে মুক্ত করতে পারবে না। আর তারা যা করছে আল্লাহ তার মহাপরিদর্শক। (সূরা বাক্বারা- ৯৬)
মানুষ সীমালঙ্ঘনকারী :
كَلَّاۤ اِنَّ الْاِنْسَانَ لَيَطْغٰى
কখনো নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে। (সূরা আলাক্ব- ৬)
মানুষ যা চায় তা পায় না :
اَمْ لِلْاِنْسَانِ مَا تَمَنّٰى
মানুষ যা চায় তাই কি সে পায়? (সূরা নাজম- ২৪)
মানুষ তা-ই পায় যার জন্য সে পরিশ্রম করে :
وَاَنْ لَّيْسَ لِلْاِنْسَانِ اِلَّا مَا سَعٰى
মানুষের জন্য কেবল তাই রয়েছে যার জন্য সে চেষ্টা করে। (সূরা নাজম- ৩৯)
মানুষের জ্ঞান সীমিত :
وَمَاۤ اُوْتِيْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ اِلَّا قَلِيْلًا
তোমাদেরকে খুব সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৮৫)
মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে কিন্তু পরে ভুলে যায় :
وَاِذَا مَسَّ الْاِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْۢبِهٖۤ اَوْ قَاعِدًا اَوْ قَآئِمًاۚ فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهٗ مَرَّ كَاَنْ لَّمْ يَدْعُنَاۤ اِلٰى ضُرٍّ مَّسَّهٗؕ كَذٰلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِيْنَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
যখন মানুষকে কোন দুঃখ-দুর্দশা স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার দুঃখ-দুর্দশা দূর করে দেই তখন সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার জন্য সে আমাকে ডাকেইনি। এভাবেই সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য তাদের কর্মকে তাদের নিকট শোভনীয় করে দেয়া হয়েছে। (সূরা ইউনুস- ১২)
وَاِذَا مَسَّ الْاِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهٗ مُنِيْبًا اِلَيْهِ ثُمَّ اِذَا خَوَّلَهٗ نِعْمَةً مِّنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوْاۤ اِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلّٰهِ اَنْدَادًا لِّيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِهٖؕ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيْلًاۗ اِنَّكَ مِنْ اَصْحَابِ النَّارِ
যখন মানুষের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার প্রতিপালকের অভিমুখী হয়ে তাকে আহবান করতে থাকে। অতঃপর যখন তিনি তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন তখন সে সেই কথাগুলো ভুলে যায়, যার জন্য ইতোপূর্বে তাঁকে আহবান করা হয়েছিল। অতঃপর তারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে, যাতে তারা অপরকেও আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। (যে এমনটি করে তাকে) বলে দাও! তুমি তোমার কুফর অবস্থায় কিছুকাল উপভোগ করে নাও, নিশ্চয় তুমি আগুনের অধিবাসীদের (জাহান্নামীদের) অন্তর্ভুক্ত। (সূরা যুমার- ৮)
ব্যাখ্যা : এ আয়াতে মানুষের সংকীর্ণমনতার জন্য তাকে পাকড়াও করা হয়েছে। এ হীনমনা কাপুরুষটি যখন দুনিয়ায় কিছু সম্পদ ও মর্যাদা লাভ করে, তখন এ সবকিছু যে মহান আল্লাহর দান এ কথা ভুলে যায় এবং মনে করে, তার মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে; যার ফলে সে এমন কিছু লাভ করেছে, যা থেকে অন্যরা বঞ্চিত হয়েছে। এ বিভ্রান্তির মাধ্যমে সে অহংকারী হয়ে যায়, যার ফলে সে কাউকে পরোয়া করে না। কিন্তু যখনই সৌভাগ্য তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দুর্ভাগ্যের আঘাত তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হীনতম কাজ করতেও কুণ্ঠিত হয় না, এমনকি শেষ পর্যন্ত সে আত্মহত্যাও করে বসে।
মানুষ অনুগ্রহ পেলে খুশি হয় আর মুসীবত আসলে অকৃতজ্ঞ হয়ে যায় :
وَاِنَّاۤ اِذَاۤ اَذَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً فَرِحَ بِهَاۚ وَاِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ ۢبِمَا قَدَّمَتْ اَيْدِيْهِمْ فَاِنَّ الْاِنْسَانَ كَفُوْرٌ
যখন আমি মানুষকে আমার রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই, তখন সে এতে উৎফুল্ল হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য কোন বিপদাপদ আসে, তখন মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়। (সূরা শূরা- ৪৮)
وَاِذَاۤ اَنْعَمْنَا عَلَى الْاِنْسَانِ اَعْرَضَ وَنَاٰ بِجَانِبِهٖۚ وَاِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ فَذُوْ دُعَآءٍ عَرِيْضٍ
যখন আমি মানুষকে নিয়ামত প্রদান করি, তখন সে (অহংকারবশত) মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দূরে সরে যায়। আবার যখন তাকে কোন অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনারত হয়ে পড়ে। (সূরা হা-মীম সাজদা- ৫১)
ব্যাখ্যা : মানুষের অপরিণামদর্শিতার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে, সে কখনো স্বচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে, অহংকার করে বেড়ায়। মনের কোণে তখন এ প্রশ্ন জাগে না যে, এ সবুজের সমারোহ শেষ হয়ে একদিন পাতা ঝরার মওসুমও আসতে পারে। কিন্তু কোন বিপদে পড়লে আবেগে সে কেঁদে ফেলে। বেদনা ও হতাশায় ডুবে যায় তার মন-মস্তিষ্ক। আবার যখন দুঃসময় পার হয়ে সুসময় আসে তখন সে আগের মতোই দম্ভ ও অহংকারে ফিরে যায়। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি পরিবর্তনশীল অবস্থায় নিজের মানসিক ভারসাম্য অটুট রাখে। সর্বাবস্থায় একটি যুক্তিসঙ্গত ও সঠিক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলে। যদি কখনো পরিস্থিতি অনুকূলে আসে এবং সে ধনাঢ্যতার উচ্চাসনে চড়তে থাকে, তাহলে সে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহংকারের নেশায় মত্ত হয়ে বিপথে পরিচালিত হয় না। আর কখনো বিপদাপদ ও সমস্যা-সংকটের করাল আঘাত আসলেও সে নিজের মানবিক চরিত্র বিনষ্ট করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিপদাপদ যে আকারেই আসুক না কেন সে ধৈর্যধারণ করে এবং দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আল্লাহ এমন লোকদের দোষ-ক্রটি ÿমা করে দেন এবং তাদের সৎকাজের পুরস্কারও প্রদান করেন।
وَخُلِقَ الْاِنْسَانُ ضَعِيْفًا
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে। (সূরা নিসা- ২৮)
اَللهُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِّنْ ضُعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ ۢبَعْدِ ضُعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ ۢبَعْدِ قُوَّةٍ ضُعْفًا وَّشَيْبَةً يَّخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ وَهُوَ الْعَلِيْمُ الْقَدِيْرٌ
তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন দুর্বল অবস্থায়। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দুর্বলতার পর শক্তি দান করেছেন, তারপর শক্তির পর পুনরায় দুর্বলতা ও বার্ধক্য দান করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন; তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। (সূরা রূম- ৫৪)
وَمَنْ نُّعَمِّرْهُ نُنَكِّسْهُ فِى الْخَلْقِؕ اَفَلَا يَعْقِلُوْنَ
আমি যাকে দীর্ঘায়ু দান করি, তার স্বাভাবিক অবস্থা উল্টে দেই। তবুও কি তারা বুঝে না? (সূরা ইয়াসীন- ৬৮)
ব্যাখ্যা : আকৃতি বদলে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ বৃদ্ধ বয়সে মানুষের অবস্থা শিশুদের মতো করে দেন। ঠিক শিশুদের মতোই তারা চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়ে। অন্যরা তাদেরকে ওঠাবসা ও খাওয়া-দাওয়াতে সহায়তা করে। এমনকি তারা নিজেদের কাপড়-চোপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা করে দেয়। মোটকথা যে ধরনের দুর্বলতার মধ্য দিয়ে তারা দুনিয়ার জীবন শুরু করেছিল, পুনরায় সে জীবনে পৌঁছে যায়।
وَلَوْ نَشَآءُ لَطَمَسْنَا عَلٰۤى اَعْيُنِهِمْ فَاسْتَبَقُوا الصِّرَاطَ فَأَنّٰى يُبْصِرُوْنَ
আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে দৃষ্টিহীন করে দিতে পারতাম, অতঃপর তারা পথ চলতে চাইলে কেমন করে দেখতে পেত? (সূরা ইয়াসীন- ৬৬)
ব্যাখ্যা : এখানে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বলছেন যে, একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখো, এ দুনিয়ায় যে জীবনের জন্য তোমরা অহংকার করছ, তা কীভাবে আল্লাহর বিপুল শক্তির কাছে একেবারে অসহায় হয়ে আছে? যে চোখের দৃষ্টিশক্তির কারণে তোমরা দুনিয়ার সমস্ত কাজ করে যাচ্ছ, আল্লাহর একটিমাত্র ইশারায় তা অন্ধ হয়ে যেতে পারে। যে পায়ের উপর ভর করে ছুটাছুটি করছ, আল্লাহর একটিমাত্র হুকুমে হঠাৎ তা অবশ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর দেয়া এ শক্তিগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত কাজ করতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আত্মহারা হয়ে থাক। কিন্তু যখন এদের মধ্য থেকে একটি শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তোমাদের শক্তির বাহাদুরি খাটে না।
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ :
خُلِقَ الْاِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍؕ سَاُرِيْكُمْ اٰيَاتِيْ فَلَا تَسْتَعْجِلُوْنِ
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব। সুতরাং তোমরা আমাকে তাড়াতাড়ি করতে বলো না। (সূরা আম্বিয়া- ৩৭)
وَكَانَ الْاِنْسَانُ عَجُوْلًا
মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রবণ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১১)
মানুষ ঝগড়াটে :
وَكَانَ الْاِنْسَانُ اَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (সূরা কাহফ- ৫৪)
اَوَلَمْ يَرَ الْاِنْسَانُ اَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُّطْفَةٍ فَاِذَا هُوَ خَصِيْمٌ مُّبِيْنٌ
মানুষ কি লক্ষ্য করে না যে, আমি তাকে শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি? এরপরও সে প্রকাশ্য তর্ককারীরূপে পরিণত হলো? (সূরা ইয়াসীন- ৭৭)
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُّعْجِبُكَ قَوْلُهٗ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللهَ عَلٰى مَا فِيْ قَلْبِهٖ وَهُوَ اَلَدُّ الْخِصَامِ
মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যার পার্থিব জীবন সংক্রান্ত কথা তোমাকে অবাক করে দেবে। আর সে তার অন্তরের বিষয়ের উপর আল্লাহকে সাক্ষী বানাবে; মূলত সে ভীষণ ঝগড়াটে। (সূরা বাক্বারা- ২০৪)
মানুষ সাধারণত কৃপণ :
قُلْ لَّوْ اَنْتُمْ تَمْلِكُوْنَ خَزَآئِنَ رَحْمَةِ رَبِّۤيْ اِذًا لَّاَمْسَكْتُمْ خَشْيَةَ الْاِنْفَاقِؕ وَكَانَ الْاِنْسَانُ قَتُوْرًا
বলো, যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভান্ডারের অধিকারীও হতে তবুও তোমরা ‘ব্যয় হয়ে যাবে’ এ আশঙ্কায় তা ধরে রাখতে; আর মানুষ অতিশয় কৃপণ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১০০)
اِنَّ الْاِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا – اِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوْعًا – وَاِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوْعًا
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির চিত্তরূপে। যখন তাকে কোন বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশকারী হয়ে উঠে। আর যখন তাকে কোন কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে অতি কৃপণে পরিণত হয়। (সূরা মা‘আরিজ, ১৯-২১)
মানুষ অকৃতজ্ঞ :
اِنَّ الْاِنْسَانَ لَكَفُوْرٌ مُّبِيْنٌ
নিশ্চয় মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ। (সূরা যুখরুফ- ১৫)
اِنَّ الْاِنْسَانَ لِرَبِّهٖ لَكَنُوْدٌ
নিশ্চয় মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ। (সূরা আদিয়্যাহ- ৬)
وَاِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِى الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ اِلَّاۤ اِيَّاهُۚ فَلَمَّا نَجَّاكُمْ اِلَى الْبَرِّ اَعْرَضْتُمْؕ وَكَانَ الْاِنْسَانُ كَفُوْرًا
যখন সমুদ্রে তোমাদেরকে কোন বিপদ স্পর্শ করে, তখন তোমরা কেবল তিনি ব্যতীত অপর যাদেরকে আহবান করে থাক তারা ব্যর্থ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৬৭)
ব্যাখ্যা : আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামতসমূহের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ বিভিন্ন রকম হয়। যেমন- এ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা যে মহান আল্লাহ, অনেকে তা আদৌ স্বীকার করে না। আবার কিছু সংখ্যক লোক এ কথা স্বীকার করে যে, এসব জিনিসের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। তবে তারা এর সাথে অন্যদেরকেও অংশীদার মনে করে, তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অন্যদের কাছে এবং তাঁর দেয়া রিযিক খেয়ে অন্যের গুণ গায়। এটা অস্বীকৃতির আরেকটি রূপ। আরো কিছু লোক আছে যারা আল্লাহকেই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা স্বীকার করে নেয়, কিন্তু নিজেদের সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধের আনুগত্য করে না। এটা অকৃতজ্ঞতা ও নিয়ামত অস্বীকার করার আরেকটি রূপ। কারণ যে ব্যক্তি এরূপ আচরণ করে সে নিয়ামতসমূহ স্বীকার করা সত্ত্বেও নিয়ামতদাতার অধিকারকে অস্বীকার করে। আরো এক শ্রেণির মানুষ মুখে নিয়ামতকে অস্বীকার করে না কিংবা নিয়ামত দানকারীর অধিকারকেও অস্বীকার করে না; কিন্তু কার্যত তাদের এবং একজন অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীর জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য থাকে না। এটা মৌখিক অস্বীকৃতি নয়, কার্যত অস্বীকৃতি।
মানুষ সাধারণত হিংসুক হয়ে থাকে :
اَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلٰى مَاۤ اٰتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهٖ
অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সেজন্য কি তারা তাদেরকে ঈর্ষা করে? (সূরা নিসা- ৫৪)
মানুষ বেশি দিন বাঁচতে চায়, মরতে চায় না :
وَلَتَجِدَنَّهُمْ اَحْرَصَ النَّاسِ عَلٰى حَيَاةٍۚ وَمِنَ الَّذِيْنَ اَشْرَكُوْا يَوَدُّ اَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ اَلْفَ سَنَةٍ وَّمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهٖ مِنَ الْعَذَابِ اَنْ يُّعَمَّرَ وَاللهُ بَصِيْرٌ ۢبِمَا يَعْمَلُوْنَ
নিশ্চয় তুমি তাদেরকে অন্যান্য লোক এবং অংশীবাদীদের চেয়েও অধিকতর আয়ু আকাঙ্ক্ষী হিসেবে পাবে। তাদের প্রত্যেকে কামনা করে যে, সে যেন হাজার বছর আয়ুপ্রাপ্ত হয়; অথচ এ দীর্ঘায়ুও তাকে (আমার) শাস্তি হতে মুক্ত করতে পারবে না। আর তারা যা করছে আল্লাহ তার মহাপরিদর্শক। (সূরা বাক্বারা- ৯৬)
মানুষ সীমালঙ্ঘনকারী :
كَلَّاۤ اِنَّ الْاِنْسَانَ لَيَطْغٰى
কখনো নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে। (সূরা আলাক্ব- ৬)
মানুষ যা চায় তা পায় না :
اَمْ لِلْاِنْسَانِ مَا تَمَنّٰى
মানুষ যা চায় তাই কি সে পায়? (সূরা নাজম- ২৪)
মানুষ তা-ই পায় যার জন্য সে পরিশ্রম করে :
وَاَنْ لَّيْسَ لِلْاِنْسَانِ اِلَّا مَا سَعٰى
মানুষের জন্য কেবল তাই রয়েছে যার জন্য সে চেষ্টা করে। (সূরা নাজম- ৩৯)
মানুষের জ্ঞান সীমিত :
وَمَاۤ اُوْتِيْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ اِلَّا قَلِيْلًا
তোমাদেরকে খুব সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৮৫)
মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে কিন্তু পরে ভুলে যায় :
وَاِذَا مَسَّ الْاِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْۢبِهٖۤ اَوْ قَاعِدًا اَوْ قَآئِمًاۚ فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهٗ مَرَّ كَاَنْ لَّمْ يَدْعُنَاۤ اِلٰى ضُرٍّ مَّسَّهٗؕ كَذٰلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِيْنَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
যখন মানুষকে কোন দুঃখ-দুর্দশা স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার দুঃখ-দুর্দশা দূর করে দেই তখন সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার জন্য সে আমাকে ডাকেইনি। এভাবেই সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য তাদের কর্মকে তাদের নিকট শোভনীয় করে দেয়া হয়েছে। (সূরা ইউনুস- ১২)
وَاِذَا مَسَّ الْاِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهٗ مُنِيْبًا اِلَيْهِ ثُمَّ اِذَا خَوَّلَهٗ نِعْمَةً مِّنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوْاۤ اِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلّٰهِ اَنْدَادًا لِّيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِهٖؕ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيْلًاۗ اِنَّكَ مِنْ اَصْحَابِ النَّارِ
যখন মানুষের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার প্রতিপালকের অভিমুখী হয়ে তাকে আহবান করতে থাকে। অতঃপর যখন তিনি তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন তখন সে সেই কথাগুলো ভুলে যায়, যার জন্য ইতোপূর্বে তাঁকে আহবান করা হয়েছিল। অতঃপর তারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে, যাতে তারা অপরকেও আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। (যে এমনটি করে তাকে) বলে দাও! তুমি তোমার কুফর অবস্থায় কিছুকাল উপভোগ করে নাও, নিশ্চয় তুমি আগুনের অধিবাসীদের (জাহান্নামীদের) অন্তর্ভুক্ত। (সূরা যুমার- ৮)
ব্যাখ্যা : এ আয়াতে মানুষের সংকীর্ণমনতার জন্য তাকে পাকড়াও করা হয়েছে। এ হীনমনা কাপুরুষটি যখন দুনিয়ায় কিছু সম্পদ ও মর্যাদা লাভ করে, তখন এ সবকিছু যে মহান আল্লাহর দান এ কথা ভুলে যায় এবং মনে করে, তার মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে; যার ফলে সে এমন কিছু লাভ করেছে, যা থেকে অন্যরা বঞ্চিত হয়েছে। এ বিভ্রান্তির মাধ্যমে সে অহংকারী হয়ে যায়, যার ফলে সে কাউকে পরোয়া করে না। কিন্তু যখনই সৌভাগ্য তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দুর্ভাগ্যের আঘাত তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হীনতম কাজ করতেও কুণ্ঠিত হয় না, এমনকি শেষ পর্যন্ত সে আত্মহত্যাও করে বসে।
মানুষ অনুগ্রহ পেলে খুশি হয় আর মুসীবত আসলে অকৃতজ্ঞ হয়ে যায় :
وَاِنَّاۤ اِذَاۤ اَذَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً فَرِحَ بِهَاۚ وَاِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ ۢبِمَا قَدَّمَتْ اَيْدِيْهِمْ فَاِنَّ الْاِنْسَانَ كَفُوْرٌ
যখন আমি মানুষকে আমার রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই, তখন সে এতে উৎফুল্ল হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য কোন বিপদাপদ আসে, তখন মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়। (সূরা শূরা- ৪৮)
وَاِذَاۤ اَنْعَمْنَا عَلَى الْاِنْسَانِ اَعْرَضَ وَنَاٰ بِجَانِبِهٖۚ وَاِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ فَذُوْ دُعَآءٍ عَرِيْضٍ
যখন আমি মানুষকে নিয়ামত প্রদান করি, তখন সে (অহংকারবশত) মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দূরে সরে যায়। আবার যখন তাকে কোন অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনারত হয়ে পড়ে। (সূরা হা-মীম সাজদা- ৫১)
ব্যাখ্যা : মানুষের অপরিণামদর্শিতার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে, সে কখনো স্বচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে, অহংকার করে বেড়ায়। মনের কোণে তখন এ প্রশ্ন জাগে না যে, এ সবুজের সমারোহ শেষ হয়ে একদিন পাতা ঝরার মওসুমও আসতে পারে। কিন্তু কোন বিপদে পড়লে আবেগে সে কেঁদে ফেলে। বেদনা ও হতাশায় ডুবে যায় তার মন-মস্তিষ্ক। আবার যখন দুঃসময় পার হয়ে সুসময় আসে তখন সে আগের মতোই দম্ভ ও অহংকারে ফিরে যায়। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি পরিবর্তনশীল অবস্থায় নিজের মানসিক ভারসাম্য অটুট রাখে। সর্বাবস্থায় একটি যুক্তিসঙ্গত ও সঠিক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলে। যদি কখনো পরিস্থিতি অনুকূলে আসে এবং সে ধনাঢ্যতার উচ্চাসনে চড়তে থাকে, তাহলে সে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহংকারের নেশায় মত্ত হয়ে বিপথে পরিচালিত হয় না। আর কখনো বিপদাপদ ও সমস্যা-সংকটের করাল আঘাত আসলেও সে নিজের মানবিক চরিত্র বিনষ্ট করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিপদাপদ যে আকারেই আসুক না কেন সে ধৈর্যধারণ করে এবং দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আল্লাহ এমন লোকদের দোষ-ক্রটি ÿমা করে দেন এবং তাদের সৎকাজের পুরস্কারও প্রদান করেন।