১
তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০৫
অধ্যায়- ১ : হিজরতের গুরুত্ব
আল্লাহর জমিন অনেক প্রশস্ত :
وَاَرْضُ اللهِ وَاسِعَةٌ ‐ اِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُوْنَ اَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
আল্লাহর জমিন প্রশস্ত; নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে অগণিত পুরস্কার দেয়া হবে। (সূরা যুমার- ১০)
يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اٰ مَنُوْاۤ اِنَّ اَرْضِيْ وَاسِعَةٌ فَاِيَّايَ فَاعْبُدُوْنِ
হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার জমিন প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আনকাবূত- ৫৬)
প্রয়োজন হলে অবশ্যই হিজরত করতে হবে :
اِنَّ الَّذِيْنَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَآئِكَةُ ظَالِمِيْۤ اَنْفُسِهِمْ قَالُوْا فِيْمَ كُنْتُمْؕ قَالُوْا كُنَّا مُسْتَضْعَفِيْنَ فِى الْاَرْضِؕ قَالُوْاۤ اَلَمْ تَكُنْ اَرْضُ اللهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوْا فِيْهَاؕ فَاُولٰٓئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ؕ وَسَآءَتْ مَصِيْرًا
যারা নিজেদের উপর যুলুম করে ফেরেশতাগণ তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, দুনিয়াতে আমরা অসহায় অবস্থায় ছিলাম। ফেরেশতাগণ বলে, আল্লাহর জমিন কি এমন প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে পারতে? এদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কতই না মন্দ আবাস! (সূরা নিসা- ৯৭)
ব্যাখ্যা : এখানে এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করার পরও কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই কাফির গোত্রের সাথে অবস্থান করছিল। তারা আংশিক মুসলিম ও আংশিক কাফির অবস্থায় জীবন-যাপন করেই সন্তুষ্ট ছিল। অথচ ইতোমধ্যে একটি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেখানে হিজরত করে নিজেদের দ্বীন ও আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী ইসলামী জীবন-যাপন করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। আর এটিই ছিল নিজেদের উপর তাদের যুলুম। কেননা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন-যাপনের মুকাবিলায় এই আধা কুফরী ও আধা ইসলামী জীবনে যে জিনিসটি তাদেরকে সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত করে তুলেছিল, সেটি যথার্থ কোন অক্ষমতা ছিল না। বরং সেটি ছিল নিজেদের পরিবার, সহায়-সম্পত্তি ও পার্থিব স্বার্থপ্রীতি। দ্বীনের উপর তারা এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
যারা অক্ষম আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন :
اِلَّا الْمُسْتَضْعَفِيْنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَآءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيْعُوْنَ حِيْلَةً وَّلَا يَهْتَدُوْنَ سَبِيْلًا ‐ فَاُولٰٓئِكَ عَسَى اللهُ اَنْ يَّعْفُوَ عَنْهُمْؕ وَكَانَ اللهُ عَفُوًّا غَفُوْرًا
তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোন উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোন পথও পায় না। আল্লাহ অচিরেই তাদের পাপ মোচন করবেন; আর আল্লাহ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। (সূরা নিসা- ৯৮, ৯৯)
নবী-রাসূলদেরকেও হিজরত করতে হয়েছে :
وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِرُسُلِهِمْ لَنُخْرِجَنَّكُمْ مِّنْ اَرْضِنَاۤ اَوْ لَتَعُوْدُنَّ فِيْ مِلَّتِنَاؕ فَاَوْحٰۤى اِلَيْهِمْ رَبُّهُمْ لَنُهْلِكَنَّ الظَّالِمِيْنَ
কাফিররা তাদের রাসূলদেরকে বলেছিল, আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে আমাদের দেশ হতে বহিষ্কার করব অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর রাসূলদেরকে তাদের প্রতিপালক ওহী করলেন যে, যালিমদেরকে অবশ্যই আমি বিনাশ করব। (সূরা ইবরাহীম- ১৩)
নবী মুহাম্মাদ ﷺ কেও হিজরত করতে হয়েছে :
اِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ اِذْ اَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ اِذْ هُمَا فِى الْغَارِ اِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهٖ لَا تَحْزَنْ اِنَّ اللهَ مَعَنَا
যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিররা তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দু’জনের দ্বিতীয়জন। যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সূরা তাওবা- ৪০)
ব্যাখ্যা : হিজরতের সময় যখন নবী ﷺ আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে হেরা পর্বতের গোহায় আত্মগোপন করলেন এবং শত্রুরাও এক সময় খুঁজতে খুঁজতে একদম কাছে এসে গিয়েছিল, এমনকি তাদের পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছিল তখন আবু বকর (রাঃ) ভয় পেয়ে ছিলেন এবং বলেছিলেন, শত্রুদের একজন যদি একটু ভেতরে ঢুকে উঁকি দেয়, তাহলে দেখে ফেলবে। কিন্তু নবী ﷺ একটুও বিচলিত না হয়ে আবু বকর (রাঃ) কে এ বলে সান্ত্বনা দিলেন, ‘‘চিন্তিত হয়ো না এবং মন খারাপও করো না; কেননা আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’’
সাহাবীদের মধ্যে কেউ মুহাজির এবং কেউ আনসার ছিলেন :
وَالسَّابِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। (সূরা তাওবা- ১০০)
আনসার সাহাবীরা মুহাজিরদেরকে খুবই সম্মান করতেন :
وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْاِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُوْنَ فِيْ صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِّمَّاۤ اُوْتُوْا وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِهٖ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
আর মুহাজিরদের (আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) ভালোবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। তারা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যারা নিজেদেরকে কৃপণতা হতে মুক্ত করেছে, তারাই সফলকাম। (সূরা হাশর- ৯)
হিজরতকালে পড়ার দু‘আ :
رَبِّ اَدْخِلْنِيْ مُدْخَلَ صِدْقٍ وَّاَخْرِجْنِيْ مُخْرَجَ صِدْقٍ وَّاجْعَلْ لِّيْ مِنْ لَّدُنْكَ سُلْطَانًا نَّصِيْرًا
বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সাথে। আর তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৮০)
আল্লাহ হিজরতকারীদেরকে উত্তম ব্যবস্থা দান করেন :
وَمَنْ يُّهَاجِرْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ يَجِدْ فِى الْاَرْضِ مُرَاغَمًا كَثِيْرًا وَّسَعَةً
যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল এবং প্রার্চুয লাভ করবে। (সূরা নিসা- ১০০)
وَالَّذِيْنَ هَاجَرُوْا فِى اللهِ مِنْ ۢبَعْدِ مَا ظُلِمُوْا لَنُبَوِّئَنَّهُمْ فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً
আর যারা অত্যাচারিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, অবশ্যই আমি তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস দান করব। (সূরা নাহল- ৪১)
ব্যাখ্যা : যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের উপর ঈমান এনেছে তার জন্য কুফরী জীবনব্যবস্থার অধীনে জীবন-যাপন করা কেবল দু’টি অবস্থায় বৈধ হতে পারে।
(এক) ইসলামকে ঐ দেশে বিজয়ী করার ও কুফরী জীবনব্যবস্থাকে ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পরিবর্তিত করার জন্য সে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাতে থাকবে যেমন আম্বিয়া (আঃ) ও তাঁর প্রাথমিক অনুসারীবৃন্দ চালিয়ে এসেছেন।
(দুই) সে সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোন পথ পায়নি, তাই চরম ঘৃণা ও অনিচ্ছা সহকারে বাধ্য হয়ে সেখানে অবস্থান করবে। এ দু’টি অবস্থা ছাড়া অন্য যে কোন অবস্থায় দারুল কুফরে অবস্থান করলে পাপ হবে।
হিজরতের সময় প্রাণের ভয় করা উচিত নয় :
كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ اِلَيْنَا تُرْجَعُوْنَ
প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী; অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা আনকাবূত- ৫৭)
ব্যাখ্যা : হিজরতের সময় প্রাণের কথা ভেব না। কেননা তা কখনো না কখনো চলে যাবেই। চিরকাল থাকার জন্য কেউই দুনিয়ায় আসেনি। কাজেই এ দুনিয়ায় কীভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে চলতে হবে- এটা তোমাদের জন্য কোন চিন্তাযোগ্য বিষয় নয়। বরং আসল চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঈমান কেমন করে বাঁচানো যাবে এবং আল্লাহর আনুগত্যের দাবী কীভাবে পূরণ করা যাবে। মনে রাখবে, শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। সুতরাং যদি তোমরা দুনিয়ায় প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঈমান হারিয়ে ফেল, তাহলে এর পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ। আর যদি ঈমান বাঁচানোর জন্য প্রাণ হারিয়ে ফেল, তাহলে এর ফল হবে অতি মঙ্গলজনক।
হিজরতের সময় রিযিকের ভয় করা যাবে না :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ دَآبَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَاۗ اَللهُ يَرْزُقُهَا وَاِيَّاكُمْؗ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ
এমন কত জীবজন্তু আছে, যারা নিজেদের খাদ্য মওজুদ রাখে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদেরকে ও তোমাদেরকে; আর তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞা। (সূরা আনকাবূত- ৬০)
ব্যাখ্যা : হিজরত করার ব্যাপারে তোমাদের প্রাণের চিন্তা তো দূরের কথা জীবিকার চিন্তাতেও অস্থির হওয়া উচিত নয়। তোমাদের চোখের সামনে যে অসংখ্য প্রাণী জলে-স্থলে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে, তাদের জীবিকার দায়িত্ব কে বহন করছে? আল্লাহই তো এদের সবাইকে প্রতিপালন করছেন। এরা যেখানেই যায় আল্লাহর অনুগ্রহে কোন না কোনভাবে জীবিকা লাভ করে থাকে। কাজেই তোমরা এ কথা ভেবে সাহস হারিয়ে ফেল না যে, যদি ঈমান রক্ষার জন্য বাড়িঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়ি তাহলে খাব কী? জেনে রেখো, আল্লাহ যেখান থেকে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টিকে রিযিক দিচ্ছেন সেখান থেকে তোমাদেরকেও দেবেন।
وَاَرْضُ اللهِ وَاسِعَةٌ ‐ اِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُوْنَ اَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
আল্লাহর জমিন প্রশস্ত; নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে অগণিত পুরস্কার দেয়া হবে। (সূরা যুমার- ১০)
يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اٰ مَنُوْاۤ اِنَّ اَرْضِيْ وَاسِعَةٌ فَاِيَّايَ فَاعْبُدُوْنِ
হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার জমিন প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আনকাবূত- ৫৬)
প্রয়োজন হলে অবশ্যই হিজরত করতে হবে :
اِنَّ الَّذِيْنَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَآئِكَةُ ظَالِمِيْۤ اَنْفُسِهِمْ قَالُوْا فِيْمَ كُنْتُمْؕ قَالُوْا كُنَّا مُسْتَضْعَفِيْنَ فِى الْاَرْضِؕ قَالُوْاۤ اَلَمْ تَكُنْ اَرْضُ اللهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوْا فِيْهَاؕ فَاُولٰٓئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ؕ وَسَآءَتْ مَصِيْرًا
যারা নিজেদের উপর যুলুম করে ফেরেশতাগণ তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, দুনিয়াতে আমরা অসহায় অবস্থায় ছিলাম। ফেরেশতাগণ বলে, আল্লাহর জমিন কি এমন প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে পারতে? এদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কতই না মন্দ আবাস! (সূরা নিসা- ৯৭)
ব্যাখ্যা : এখানে এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করার পরও কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই কাফির গোত্রের সাথে অবস্থান করছিল। তারা আংশিক মুসলিম ও আংশিক কাফির অবস্থায় জীবন-যাপন করেই সন্তুষ্ট ছিল। অথচ ইতোমধ্যে একটি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেখানে হিজরত করে নিজেদের দ্বীন ও আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী ইসলামী জীবন-যাপন করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। আর এটিই ছিল নিজেদের উপর তাদের যুলুম। কেননা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন-যাপনের মুকাবিলায় এই আধা কুফরী ও আধা ইসলামী জীবনে যে জিনিসটি তাদেরকে সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত করে তুলেছিল, সেটি যথার্থ কোন অক্ষমতা ছিল না। বরং সেটি ছিল নিজেদের পরিবার, সহায়-সম্পত্তি ও পার্থিব স্বার্থপ্রীতি। দ্বীনের উপর তারা এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
যারা অক্ষম আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন :
اِلَّا الْمُسْتَضْعَفِيْنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَآءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيْعُوْنَ حِيْلَةً وَّلَا يَهْتَدُوْنَ سَبِيْلًا ‐ فَاُولٰٓئِكَ عَسَى اللهُ اَنْ يَّعْفُوَ عَنْهُمْؕ وَكَانَ اللهُ عَفُوًّا غَفُوْرًا
তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোন উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোন পথও পায় না। আল্লাহ অচিরেই তাদের পাপ মোচন করবেন; আর আল্লাহ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। (সূরা নিসা- ৯৮, ৯৯)
নবী-রাসূলদেরকেও হিজরত করতে হয়েছে :
وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِرُسُلِهِمْ لَنُخْرِجَنَّكُمْ مِّنْ اَرْضِنَاۤ اَوْ لَتَعُوْدُنَّ فِيْ مِلَّتِنَاؕ فَاَوْحٰۤى اِلَيْهِمْ رَبُّهُمْ لَنُهْلِكَنَّ الظَّالِمِيْنَ
কাফিররা তাদের রাসূলদেরকে বলেছিল, আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে আমাদের দেশ হতে বহিষ্কার করব অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর রাসূলদেরকে তাদের প্রতিপালক ওহী করলেন যে, যালিমদেরকে অবশ্যই আমি বিনাশ করব। (সূরা ইবরাহীম- ১৩)
নবী মুহাম্মাদ ﷺ কেও হিজরত করতে হয়েছে :
اِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ اِذْ اَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ اِذْ هُمَا فِى الْغَارِ اِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهٖ لَا تَحْزَنْ اِنَّ اللهَ مَعَنَا
যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিররা তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দু’জনের দ্বিতীয়জন। যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সূরা তাওবা- ৪০)
ব্যাখ্যা : হিজরতের সময় যখন নবী ﷺ আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে হেরা পর্বতের গোহায় আত্মগোপন করলেন এবং শত্রুরাও এক সময় খুঁজতে খুঁজতে একদম কাছে এসে গিয়েছিল, এমনকি তাদের পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছিল তখন আবু বকর (রাঃ) ভয় পেয়ে ছিলেন এবং বলেছিলেন, শত্রুদের একজন যদি একটু ভেতরে ঢুকে উঁকি দেয়, তাহলে দেখে ফেলবে। কিন্তু নবী ﷺ একটুও বিচলিত না হয়ে আবু বকর (রাঃ) কে এ বলে সান্ত্বনা দিলেন, ‘‘চিন্তিত হয়ো না এবং মন খারাপও করো না; কেননা আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’’
সাহাবীদের মধ্যে কেউ মুহাজির এবং কেউ আনসার ছিলেন :
وَالسَّابِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। (সূরা তাওবা- ১০০)
আনসার সাহাবীরা মুহাজিরদেরকে খুবই সম্মান করতেন :
وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْاِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُوْنَ فِيْ صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِّمَّاۤ اُوْتُوْا وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِهٖ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
আর মুহাজিরদের (আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) ভালোবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। তারা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যারা নিজেদেরকে কৃপণতা হতে মুক্ত করেছে, তারাই সফলকাম। (সূরা হাশর- ৯)
হিজরতকালে পড়ার দু‘আ :
رَبِّ اَدْخِلْنِيْ مُدْخَلَ صِدْقٍ وَّاَخْرِجْنِيْ مُخْرَجَ صِدْقٍ وَّاجْعَلْ لِّيْ مِنْ لَّدُنْكَ سُلْطَانًا نَّصِيْرًا
বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সাথে। আর তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৮০)
আল্লাহ হিজরতকারীদেরকে উত্তম ব্যবস্থা দান করেন :
وَمَنْ يُّهَاجِرْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ يَجِدْ فِى الْاَرْضِ مُرَاغَمًا كَثِيْرًا وَّسَعَةً
যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল এবং প্রার্চুয লাভ করবে। (সূরা নিসা- ১০০)
وَالَّذِيْنَ هَاجَرُوْا فِى اللهِ مِنْ ۢبَعْدِ مَا ظُلِمُوْا لَنُبَوِّئَنَّهُمْ فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً
আর যারা অত্যাচারিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, অবশ্যই আমি তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস দান করব। (সূরা নাহল- ৪১)
ব্যাখ্যা : যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের উপর ঈমান এনেছে তার জন্য কুফরী জীবনব্যবস্থার অধীনে জীবন-যাপন করা কেবল দু’টি অবস্থায় বৈধ হতে পারে।
(এক) ইসলামকে ঐ দেশে বিজয়ী করার ও কুফরী জীবনব্যবস্থাকে ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পরিবর্তিত করার জন্য সে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাতে থাকবে যেমন আম্বিয়া (আঃ) ও তাঁর প্রাথমিক অনুসারীবৃন্দ চালিয়ে এসেছেন।
(দুই) সে সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোন পথ পায়নি, তাই চরম ঘৃণা ও অনিচ্ছা সহকারে বাধ্য হয়ে সেখানে অবস্থান করবে। এ দু’টি অবস্থা ছাড়া অন্য যে কোন অবস্থায় দারুল কুফরে অবস্থান করলে পাপ হবে।
হিজরতের সময় প্রাণের ভয় করা উচিত নয় :
كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ اِلَيْنَا تُرْجَعُوْنَ
প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী; অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা আনকাবূত- ৫৭)
ব্যাখ্যা : হিজরতের সময় প্রাণের কথা ভেব না। কেননা তা কখনো না কখনো চলে যাবেই। চিরকাল থাকার জন্য কেউই দুনিয়ায় আসেনি। কাজেই এ দুনিয়ায় কীভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে চলতে হবে- এটা তোমাদের জন্য কোন চিন্তাযোগ্য বিষয় নয়। বরং আসল চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঈমান কেমন করে বাঁচানো যাবে এবং আল্লাহর আনুগত্যের দাবী কীভাবে পূরণ করা যাবে। মনে রাখবে, শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। সুতরাং যদি তোমরা দুনিয়ায় প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঈমান হারিয়ে ফেল, তাহলে এর পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ। আর যদি ঈমান বাঁচানোর জন্য প্রাণ হারিয়ে ফেল, তাহলে এর ফল হবে অতি মঙ্গলজনক।
হিজরতের সময় রিযিকের ভয় করা যাবে না :
وَكَاَيِّنْ مِّنْ دَآبَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَاۗ اَللهُ يَرْزُقُهَا وَاِيَّاكُمْؗ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ
এমন কত জীবজন্তু আছে, যারা নিজেদের খাদ্য মওজুদ রাখে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদেরকে ও তোমাদেরকে; আর তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞা। (সূরা আনকাবূত- ৬০)
ব্যাখ্যা : হিজরত করার ব্যাপারে তোমাদের প্রাণের চিন্তা তো দূরের কথা জীবিকার চিন্তাতেও অস্থির হওয়া উচিত নয়। তোমাদের চোখের সামনে যে অসংখ্য প্রাণী জলে-স্থলে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে, তাদের জীবিকার দায়িত্ব কে বহন করছে? আল্লাহই তো এদের সবাইকে প্রতিপালন করছেন। এরা যেখানেই যায় আল্লাহর অনুগ্রহে কোন না কোনভাবে জীবিকা লাভ করে থাকে। কাজেই তোমরা এ কথা ভেবে সাহস হারিয়ে ফেল না যে, যদি ঈমান রক্ষার জন্য বাড়িঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়ি তাহলে খাব কী? জেনে রেখো, আল্লাহ যেখান থেকে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টিকে রিযিক দিচ্ছেন সেখান থেকে তোমাদেরকেও দেবেন।